পথে বিপথে / আন্দামান
তার আগের দু’ঘন্টা তো মেঘ ছাড়া কিছুই দেখতে পাইনি । নীচে মেঘ, উপরে মেঘ, জানালার বাইরে স্থির হয়ে আছে মেঘ । যে দিকে দেখি খালি সাদা সাদা তুলো । নড়ছেও না চড়ছেও না। আর মাঝখানে আমরা যেন স্রেফ ভেসে আছি । এক্কেবারে স্থির । নিরালম্ব । গতিজাড্যর সামান্যতম প্রমাণ বিহীন ।
জীবনের প্রথম প্লেনে চাপার অনুভূতি আরও রোমাঞ্চকর হবে, আশা
করেছিলাম । অন্তত, একটু শ্বাস কষ্ট, বমি
ভাব, মাথা ঘোরা, ইত্যাদি প্রভৃতি কিছু
তো হবে ! তারপর ওই যে, কি যেন বলে, এয়ার
পকেট না এয়ার বাম্প, সে সব কিছুই কি হওয়ার নেই মোটে ?
দেড় হাজার কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে, যাচ্ছি তো
ঠিক গন্তব্যে ? কী জানি বাবা, এ'তো রবি ঠাকুরের প্রথম রেল যাত্রার মত মনে হচ্ছে । কিছুই ঘটল না । সব অমনিই
হয়ে গেলো ।
সুন্দরি বিমানবালার হাসি সহযোগে প্রাতরাশ বিতরণই যা একটু অন্য রকম । আর বাকি সব রাজধানী এক্সপ্রেসের চেয়ার কারের মত । বসার গদি, রং, সাইজ, দুপাশের শেল্ফ, এমনকি মাঝের প্যাসেজটা পর্য্যন্ত হুবহু এক ।
অনেকেই দেখলাম ডেইলি প্যাসেঞ্জারের মত, প্লেনে উঠেই ঘুমিয়ে পড়লেন । জাগলেন একেবারে পোর্টব্লেয়ার পৌঁছে ।
ও, বলা হয়নি । আমরা আন্দামান যাচ্ছি । দুর্গা পুজোর পর, দ্বাদশীর দিন, ১৬ অক্টোবর বুধবার সকালে । নেতাজি সুভাষ বিমান বন্দর থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট । আমরা, মানে তিনটি পরিবারের নয় জন । তিন বাবা, তিন মা, তিন ছেলে । ফেরার টিকিট পরের বুধবার ।

সুন্দরি বিমানবালার হাসি সহযোগে প্রাতরাশ বিতরণই যা একটু অন্য রকম । আর বাকি সব রাজধানী এক্সপ্রেসের চেয়ার কারের মত । বসার গদি, রং, সাইজ, দুপাশের শেল্ফ, এমনকি মাঝের প্যাসেজটা পর্য্যন্ত হুবহু এক ।
অনেকেই দেখলাম ডেইলি প্যাসেঞ্জারের মত, প্লেনে উঠেই ঘুমিয়ে পড়লেন । জাগলেন একেবারে পোর্টব্লেয়ার পৌঁছে ।
ও, বলা হয়নি । আমরা আন্দামান যাচ্ছি । দুর্গা পুজোর পর, দ্বাদশীর দিন, ১৬ অক্টোবর বুধবার সকালে । নেতাজি সুভাষ বিমান বন্দর থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট । আমরা, মানে তিনটি পরিবারের নয় জন । তিন বাবা, তিন মা, তিন ছেলে । ফেরার টিকিট পরের বুধবার ।
প্লেন যত নীচে নামে তত ভয় বাড়তে থাকে । সমুদ্রের জল নীল হয় জানতাম । এ তো পুরো কালো । মাঝে মাঝে দু একটা দ্বীপ দেখা যাচ্ছে বটে । কিন্তু তাও ঘন সবুজ । জঙ্গলময় । বাড়ি ঘর শহর কই ? আর এয়ারপোর্ট ? প্লেন নামবে কোথায় ?
হঠাৎ, প্লেনের ডিম্বাকৃতি জানালা দিয়ে দেখতে
পেলাম, পাশ দিয়ে গাছপালা ছুটছে । নারকেল গাছের পাতাটা চিনতে
পারলাম । বাকি সব আরো উঁচু উঁচু গাছ সাঁ সাঁ করে সরে যাচ্ছে । প্রমাদ গুনলাম,
প্লেন তাহলে পাহাড়েই ধাক্কা খাচ্ছে । জলে ডুবছে না ।
একদিকে ভালো । ইস, সাঁতারটা জানা থাকলে বেঁচে যেত, গোছের ন্যাকা কথা শুনতে হবে না । প্লেনের সবাই একসাথেই মরব ।
আর মাত্রই কয়েক মুহূর্ত । তারপর বুউউ..ম । প্রচন্ড বিস্ফোরণে কেঁপে উঠবে চারপাশ । বিশাল আগুনের গোলা লাফিয়ে উঠবে আকাশে । আমেরিকার টুইন টাওয়ারের মতো । মৃত্যু এবং দাহকার্য্য একই সাথে হয়ে যাবে । ল্যাঠা চুকবে ।
এইসব ভাবতে ভাবতেই, টের পেলাম, ছোট্ট একটা ঝাঁকুনি দিয়ে প্লেন মাটি ছুঁল । তারপর দুপাশের গাছপালা উপেক্ষা করে, প্রাণ বেগে ছুটতে লাগলো । একটা বাঁক ঘুরে, এক সময় থেমেও গেলো । বীর সাভারকর টার্মিনালের ঠিক সামনেটায় । যাক, মরিনি তাহলে ।
একদিকে ভালো । ইস, সাঁতারটা জানা থাকলে বেঁচে যেত, গোছের ন্যাকা কথা শুনতে হবে না । প্লেনের সবাই একসাথেই মরব ।
আর মাত্রই কয়েক মুহূর্ত । তারপর বুউউ..ম । প্রচন্ড বিস্ফোরণে কেঁপে উঠবে চারপাশ । বিশাল আগুনের গোলা লাফিয়ে উঠবে আকাশে । আমেরিকার টুইন টাওয়ারের মতো । মৃত্যু এবং দাহকার্য্য একই সাথে হয়ে যাবে । ল্যাঠা চুকবে ।
এইসব ভাবতে ভাবতেই, টের পেলাম, ছোট্ট একটা ঝাঁকুনি দিয়ে প্লেন মাটি ছুঁল । তারপর দুপাশের গাছপালা উপেক্ষা করে, প্রাণ বেগে ছুটতে লাগলো । একটা বাঁক ঘুরে, এক সময় থেমেও গেলো । বীর সাভারকর টার্মিনালের ঠিক সামনেটায় । যাক, মরিনি তাহলে ।
সমস্ত যাত্রীর প্লেন থেকে নামার তাড়া দেখে আবার শিয়ালদা রেল স্টেশনের কথা মনে পড়ে গেলো । কারো অফিসে বোধহয় লাল কালির দাগ পড়ে গেছে এতক্ষণে । আমাদেরই কোন তাড়া নেই । সুবেশা, সুন্দরি বিমান বালার ''আপনার যাত্রা শুভ হোক'' শুনতে শুনতে সব শেষে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামলাম ।
দ্বীপভূমি স্পর্শ করে প্রথম অনুভুতি হোল, এসে গেলাম ? এত তাড়াতাড়ি ? এত সহজে ? আন্দামানই তো ? পোর্টব্লেয়ার ? এটাই ?
ঘড়ি বলছে মাত্র দু’ঘন্টা দশ মিনিট হয়েছে দমদম ছেড়েছি । চার পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, খালি ছোট ছোট পাহাড়ের টিলা দেখা যাচ্ছে । অনেকটা আমাদের পুরুলিয়া বাঁকুড়া ছোটনাগপুরের মালভূমি অঞ্চলের মত । কিন্তু গাছের বৈচিত্রে আবার সম্পুর্ণ বিপরীত ।মালভূমির রুখু সুখু জল না পাওয়া, অপুষ্টিতে ভোগা গাছ তো এগুলো নয় । রীতিমত তরতাজা সুঠাম বলশালী যুবক যেন । পাতার রং ঝক ঝকে শ্যাওলার মত সবুজ । কান্ড মোটা এবং কালো । উচ্চতায় এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায় । বুঝলাম, সারা বছর প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এখানে । এই গাছেদের গোত্রের সঙ্গে, মালভূমির না, কিছু মিল পাওয়া যেতে পারে কেরলের গাছপালার ।
চিরহরিত বনভূমি বা এভারগ্রিন ফরেস্ট নামের সার্থকতা নিয়ে ছেলেগুলোর উপর মাস্টারি করছি, চোখ গেলো আকাশের দিকে । এত নীল হয় আকাশ ? এত গাঢ় ঝকঝকে নীল ? যেন নেভি ব্লু রঙের ভেলভেটের চাদর সূর্য্যের আলোয় ঠিকরোচ্ছে । সূর্য্যও যেন অনেক বেশি আলো ছড়াচ্ছে না আজ ? ব্যাপার কী ?
ব্যাপার যে গুরুতর, টের পেলাম আশিসদার উদাত্ত কন্ঠে । দলের লিডার আশিস
বাগচি গলা ছেড়ে গান ধরেছেন, ''আহা কী আনন্দ আকাশে
বাতাসে..........'' ।
বীর সাভারকর এয়ার পোর্ট থেকে লাগেজ-টাগেজ নিয়ে বেরোতে একটু দেরিই
হল । সব কিছু দেখতে দেখতে চলেছি । তাড়া নেই, সবে সকাল সাড়ে আটটা । ছোট্ট এয়ার পোর্ট । আন্দামানের দ্বীপভূমিতে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে
। যাদের তাড়া ছিল সবাই ততক্ষণে নিজ গন্তব্যে পৌছে গেল বোধহয় ।
লাউঞ্জ থেকে বেরোতেই, দু'তিন জন এগিয়ে এল । গাড়ি লাগবে সাব ? কোন ট্রাভেলিং কোম্পানি ? কোন হোটেল ? .......ইত্যাদি প্রশ্ন ধেয়ে এল । আমরা হোটেল বুক করে যাইনি শুনে আগ্রহ যেন বেড়ে গেলো ।
ওদেরই মধ্যে একজনকে একটু পছন্দ হল আশিসদার । বাংলা, হিন্দি, ইংরাজি তুখোড় বলছে । মাঝে মাঝে তামিল বা তেলেগুতে ফোনে কাকে যেন কীসব ডাইরেকশন দিচ্ছে । কালো শক্ত পোক্ত চেহারা । চোখে মোটা করে কাজল বা সুরমা লাগানো । মুখে পানপরাগ জাতীয় কিছু । অনবরত চিবাচ্ছে । গলায় মোটা সোনার চেন । তাতে আবার বড় চৌকো ম্যাচ বাক্সের মত একটা তাবিজ ঝুলছে । চাউনিতে একটা সবজান্তা ভাব ।
আশিসদা কী দেখে যে লোকটাকে পছন্দ করলো ভাবতে লেগেছি । দেখি অন্য গাড়ির ড্রাইভাররাও হাসি মুখে আমাদের মাল পত্র ওই কালো ছেলের গাড়িতে তুলতে লেগেছে । অবাক লাগলো । এ রকম তো হয় না বিশেষ ।
লাউঞ্জ থেকে বেরোতেই, দু'তিন জন এগিয়ে এল । গাড়ি লাগবে সাব ? কোন ট্রাভেলিং কোম্পানি ? কোন হোটেল ? .......ইত্যাদি প্রশ্ন ধেয়ে এল । আমরা হোটেল বুক করে যাইনি শুনে আগ্রহ যেন বেড়ে গেলো ।
ওদেরই মধ্যে একজনকে একটু পছন্দ হল আশিসদার । বাংলা, হিন্দি, ইংরাজি তুখোড় বলছে । মাঝে মাঝে তামিল বা তেলেগুতে ফোনে কাকে যেন কীসব ডাইরেকশন দিচ্ছে । কালো শক্ত পোক্ত চেহারা । চোখে মোটা করে কাজল বা সুরমা লাগানো । মুখে পানপরাগ জাতীয় কিছু । অনবরত চিবাচ্ছে । গলায় মোটা সোনার চেন । তাতে আবার বড় চৌকো ম্যাচ বাক্সের মত একটা তাবিজ ঝুলছে । চাউনিতে একটা সবজান্তা ভাব ।
আশিসদা কী দেখে যে লোকটাকে পছন্দ করলো ভাবতে লেগেছি । দেখি অন্য গাড়ির ড্রাইভাররাও হাসি মুখে আমাদের মাল পত্র ওই কালো ছেলের গাড়িতে তুলতে লেগেছে । অবাক লাগলো । এ রকম তো হয় না বিশেষ ।
বেশ বড় ১৪ সিটের গাড়ি । যথেষ্ট আরামদায়ক । গাড়ির স্টিয়ারিং এক হাতে
ধরে, অন্য হাতে নাগাড়ে ফোনালাপ করে চলছে ছেলে, তেলেগুতে । যেটুকু বুঝলাম,
আমাদেরই জন্য হোটেল খুঁজছে । তাও ভাল । নাম বলল, রাজেন্দ্র ।
রাজেন্দ্র ? আমি তো অন্য কিছু ভাবছিলাম । যাক গে --
রাজেন্দ্র ? আমি তো অন্য কিছু ভাবছিলাম । যাক গে --
ছোট ছোট পাহাড়ের বাঁক ঘুরে অবলীলায় এগিয়ে চলেছে টেম্পো ট্রাভেলার ।
মাঝে মাঝে থামছে কোন হোটেলের সামনে । গাড়ি স্টার্ট রেখেই নেমে যাচ্ছে রাজেন্দ্র । ঘুরে আসছে কয়েক
মিনিট পরেই মাথা নাড়তে নাড়তে । তিনটে এসি রুম, এই ভরা সিজিনে, টানা তিন দিনের জন্য, হঠাৎ করে পাওয়া সত্যিই মুশকিল
।
আমরা হতাশ হয়ে পড়ছি । মহিলাদের মুখ হাঁড়ি হয়ে গেছে । কথাবার্তা বিশেষ শোনা যাচ্ছে না । বাচ্চা গুলোও আর পারছে না । প্লেন ধরার তাড়ায় রাতে কারোরই ভাল ঘুম হয়নি । রাজেন্দ্রের কিন্তু ক্লান্তি নেই । ভাবিজিদের পছন্দের হোটেল সে খুঁজে দেবেই ।
একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, এখানে রাস্তা ঘাটে প্রচুর মুসলমান । দলে দলে চলেছে বোধহয় মসজিদের পথে । মাথায় গোল সাদা নেমাজি টুপি, চোখে সুর্মা ।
রাজেন্দ্র খুব পপুলার মনে হোল । সবাই খুব আন্তরিক গলায়, আসস্লাম ওয়ালেকুম, ওয়ালেকুম আসস্লাম দিয়ে কথা শুরু করছে । আবার দুর্গা পুজোর প্যান্ডেলের অবশেষও যেন দেখা যাচ্ছে মোড়ে মোড়ে । সবে পরশুই তো ছিল দশমি । ব্যাপারটা খোলসা করার জন্য রাজেন্দ্রকেই জিজ্ঞেস করলাম,
- এখানে কি অধিকাংশই মুসলিম ? মানে এত লোক দেখছি মাথায় টুপি পরে....... ?
গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই ও বলল,
- আমরা দাদা সবাই হিন্দু, সবাই মুসলমান, সবাই খ্রিস্টান, শিখ, জৈন......... । আজ শবেবরাত তো, তাই সবাই মসজিদে যাচ্ছে নমাজ পড়তে । আপনাদের নামিয়ে দিয়ে আমিও যাব । দু'দিন আগেই দুর্গা পুজোর বিসর্জন করেছি । খুব ধুমধাম করে দুর্গা পূজা হয় এখানে । আবার ঈদও হয় । মহরম হয় । ক্রিসমাস হয় । গুরু নানকজীর জন্মদিন পালন হয় । যখন যে ধর্মের উৎসব হয় আমরা গোটা আন্দামান তখন সেই ধর্মের হয়ে যাই । আজ যেমন সবাইকে দেখে ভাবছেন মুসলমান, দু'দিন আগে এলে ভাবতেন হিন্দু । ২৫ ডিসেম্বর এলে ভাববেন ক্রিশ্চান ।
আমরা হতাশ হয়ে পড়ছি । মহিলাদের মুখ হাঁড়ি হয়ে গেছে । কথাবার্তা বিশেষ শোনা যাচ্ছে না । বাচ্চা গুলোও আর পারছে না । প্লেন ধরার তাড়ায় রাতে কারোরই ভাল ঘুম হয়নি । রাজেন্দ্রের কিন্তু ক্লান্তি নেই । ভাবিজিদের পছন্দের হোটেল সে খুঁজে দেবেই ।
একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, এখানে রাস্তা ঘাটে প্রচুর মুসলমান । দলে দলে চলেছে বোধহয় মসজিদের পথে । মাথায় গোল সাদা নেমাজি টুপি, চোখে সুর্মা ।
রাজেন্দ্র খুব পপুলার মনে হোল । সবাই খুব আন্তরিক গলায়, আসস্লাম ওয়ালেকুম, ওয়ালেকুম আসস্লাম দিয়ে কথা শুরু করছে । আবার দুর্গা পুজোর প্যান্ডেলের অবশেষও যেন দেখা যাচ্ছে মোড়ে মোড়ে । সবে পরশুই তো ছিল দশমি । ব্যাপারটা খোলসা করার জন্য রাজেন্দ্রকেই জিজ্ঞেস করলাম,
- এখানে কি অধিকাংশই মুসলিম ? মানে এত লোক দেখছি মাথায় টুপি পরে....... ?
গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই ও বলল,
- আমরা দাদা সবাই হিন্দু, সবাই মুসলমান, সবাই খ্রিস্টান, শিখ, জৈন......... । আজ শবেবরাত তো, তাই সবাই মসজিদে যাচ্ছে নমাজ পড়তে । আপনাদের নামিয়ে দিয়ে আমিও যাব । দু'দিন আগেই দুর্গা পুজোর বিসর্জন করেছি । খুব ধুমধাম করে দুর্গা পূজা হয় এখানে । আবার ঈদও হয় । মহরম হয় । ক্রিসমাস হয় । গুরু নানকজীর জন্মদিন পালন হয় । যখন যে ধর্মের উৎসব হয় আমরা গোটা আন্দামান তখন সেই ধর্মের হয়ে যাই । আজ যেমন সবাইকে দেখে ভাবছেন মুসলমান, দু'দিন আগে এলে ভাবতেন হিন্দু । ২৫ ডিসেম্বর এলে ভাববেন ক্রিশ্চান ।
আপনারা, মেন ল্যান্ডে থাকেন তো, তাই মেলাতে পারবেন না । আন্দামানে আমরা সবাই সব ধর্মাবলম্বী । সেকুলার । প্রকৃত অর্থেই । আমাদের নিয়ম আপনাদের মত নয় ।
কথাটা খট করে কানে বাজলো । সত্যিই কি সব ধর্মের দেশ আন্দামান ?
ধর্মে ধর্মে বিভেদ মোটে নেই এখানে ? তাও আবার
হয় ? মোল্লা-পাদ্রি-পুরোহিত তন্ত্র থাবা বসাতে পারেনি
এখানকার মানুষের মনে ? কথাটা বিশ্বাস করতে ভাল লাগলেও মন
থেকে মেনে নিতে পারি না ।
স্কুলে পড়তে আরো অনেকের মত আমিও সন্তু
কাকাবাবুর ফ্যান ছিলাম । আনন্দমেলায় প্রকাশিত কাকাবাবুর প্রতিটা অভিযানের গল্প
গোগ্রাসে গিলতাম । সবুজ দ্বীপের রাজা ছবিটাও কিশোর
বয়সে মনে দাগ কেটেছিলো । তাছাড়া, কলেজ
জীবনের দু'দুজন বন্ধু চাকরি সূত্রে আন্দামানে পোস্টিং ছিল
একসময় । তারা ঘুরতে যেতে বললেও যাওয়া হয়নি তখন । মূলত আর্থিক কারণেই । যদিও তাদের
পাঠানো, আন্দামান সম্পর্কিত বইপত্র ও ছবি, আমাকে চিরকাল ওই দ্বীপভূমির প্রতি আকৃষ্ট করেছে । তাই মার্চ মাসে আশিসদা
যখন বলল, এবার আন্দামান ; রক্ত চলকে
উঠল । আন্দামান ! সেই জল আর অরণ্যের আদিম ভূমি ? জারোয়া
ওঙ্গিজদের দেশ ?
যাওয়া তো যায়, কিন্তু খরচ পোষাবো কী করে ? তিনজনের প্লেন ফেয়ারই তো অনেক । তারপর ঘোরা, হোটেল ভাড়া, খাওয়া । বললাম,
- দাদা এবার আমাদের বাদ দাও । পকেটের অত জোর নেই আমার ।
আশিসদা যেন আগে থেকেই জানত আমার অ্যালিবাইটা । মুচকি হেসে বলল,
- খরচের জন্য পৃথিবীতে কোন ভাল কাজ আটকায় না বুঝলে । আসল হল ইচ্ছে । বেশ বুঝতে পারছি তোমার যাওয়ার ইচ্ছে ষোল আনা ।
বললাম,
- তা তো আছে, কিন্তু......।
- আবার কিন্তু কী ? ছাব্বিশ হাজার এখন দিতে পারবে না ?
আমতা আমতা করে বললাম,
- ২৬ হাজারে আমাদের তিনজনকে আন্দামান ঘোরাতে কে নিয়ে যাবে ?
আবার ধমক -
- কেউ নিয়ে যাবে না, নিজেই যাবে । আমি নেটে দেখে নিয়েছি, ছয় মাস আগে কাটলে, তিনজনের যাওয়া আসা মিলে প্লেনের ভাড়া পড়বে ওই ২৬ হাজার মত । এপ্রিল মাসে টিকিট কাটব । টাকাটা রেডি রেখো । বাকি বেড়ানোর খরচ, ছ'মাস ধরে জমাও না । এখনো তো অনেক সময় আছে ।
যাওয়া তো যায়, কিন্তু খরচ পোষাবো কী করে ? তিনজনের প্লেন ফেয়ারই তো অনেক । তারপর ঘোরা, হোটেল ভাড়া, খাওয়া । বললাম,
- দাদা এবার আমাদের বাদ দাও । পকেটের অত জোর নেই আমার ।
আশিসদা যেন আগে থেকেই জানত আমার অ্যালিবাইটা । মুচকি হেসে বলল,
- খরচের জন্য পৃথিবীতে কোন ভাল কাজ আটকায় না বুঝলে । আসল হল ইচ্ছে । বেশ বুঝতে পারছি তোমার যাওয়ার ইচ্ছে ষোল আনা ।
বললাম,
- তা তো আছে, কিন্তু......।
- আবার কিন্তু কী ? ছাব্বিশ হাজার এখন দিতে পারবে না ?
আমতা আমতা করে বললাম,
- ২৬ হাজারে আমাদের তিনজনকে আন্দামান ঘোরাতে কে নিয়ে যাবে ?
আবার ধমক -
- কেউ নিয়ে যাবে না, নিজেই যাবে । আমি নেটে দেখে নিয়েছি, ছয় মাস আগে কাটলে, তিনজনের যাওয়া আসা মিলে প্লেনের ভাড়া পড়বে ওই ২৬ হাজার মত । এপ্রিল মাসে টিকিট কাটব । টাকাটা রেডি রেখো । বাকি বেড়ানোর খরচ, ছ'মাস ধরে জমাও না । এখনো তো অনেক সময় আছে ।
হোটেলটা ছোট । পোর্টব্লেয়ারের প্রাণ কেন্দ্র, ঘড়ি মোড় থেকে একটু দূরেই । কিন্তু ঘর দেখে
ঘরণিদের পছন্দ হয়ে গেলো । প্রশস্ত বিছানা, আসবাব, পর্দা, টিভি সবই পছন্দসই । এসি তো আছেই । বাথরুমের ফিটিংসও নতুনই মনে হল । লাগোয়া
ব্যালকনি থেকে এয়ারপোর্টের প্লেন ওঠা নামা দেখা যায় । দোতলায় দুটি ডাবল বেড আর
একটা ট্রিপিল বেড যেন আমাদের জন্যই খালি পড়ে ছিল । ভাড়া যথেষ্ট কম । বাজেট
টুরিস্টদের জন্য আদর্শ ।ডাবল বেড দুটোর একটা আশিসদারা, একটা আমরা নিলাম । আশিসদার ছেলের বয়স ১১, আমারটার সাড়ে ১২ । ডাবল বেডই যথেষ্ট । শুভদার ছেলে একটু বড়, কলেজে পড়ে । ওরা নিল ট্রিপল বেডটা । আমাদের স্নান-টান করে রেডি হয়ে নিতে বলে রাজেন্দ্র জানাল, বারোটার মধ্যে সে ফিরে আসছে । দুপুরের লাঞ্চ খাওয়াতে নিয়ে যাবে আন্দামানের সেরা, বেঙ্গল রেস্টোরেন্টে । আ্মাদের হোটেলের একতলায় ডাইনিং কাম বার আছে যদিও । ফ্যামিলি নিয়ে সেখানে খেতে যাওয়া নাকি ঠিক হবে না । ....মাতালদের আড্ডা ।
জানিয়ে রাখা দরকার, রাজেন্দ্রের সঙ্গে আশিসদা ইতিমধ্যেই কথা বলে নিয়েছে । সাত দিনের ট্যুরের পুরো ট্রান্সপোর্ট ওর । এয়ারপোর্ট টু এয়ারপোর্ট যাবতীয় যানবাহন । যার মধ্যে জলিবয় আইল্যান্ড, হ্যাভলক, ও নীল আইল্যান্ডের ওয়াটার ভেসেলও ধরা আছে । মোট কন্ট্রাক্ট ৩০ হাজার টাকা । আশিসদার ভাষায়, ড্যাঞ্চি ।
বিকেলে, এক ঘুম দিয়ে উঠে প্রথম দ্রষ্টব্য সেলুলার জেল ।
স্বাধীন ভারতের নাগরিকের কাছে অবশ্য, জেল নয়, স্মারক সৌধ, তীর্থ স্থান । স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িয়ে
পড়া সব চেয়ে 'খতরনাক' বিপ্লবীদের
পাঠানো হত এই জেলে । দেশ বরেণ্য এই সব বিপ্লবিদের উপর চলত অকথ্য অত্যাচার । তারই
একটা ছোট্ট উপস্থাপনা আলো ও ধ্বনির সাহায্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ৪০ মিনিটের লাইট
এন্ড সাউন্ড শো-এ । সেলুলার জেলের ইতিহাস । জেলের মধ্যেকার প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের
জবানবন্দিতে ।
টিকিট লাইনে দাঁড়িয়ে কেটে রেখেছে রাজেন্দ্রের লোক । আমরা যেতেই প্রত্যেকের হাতে হাতে ধরিয়ে দিল । লাইন দিয়ে ভিতরে ঢুকে নির্দিষ্ট চেয়ারে বসলাম । সামনে থেকে দুটি জোরালো আলো দর্শকদের দিকে ফেলা হয়েছে। তাই অন্য কিছু নজরে পড়ছে না ।
হঠাত ঝপ করে আলোটা নিভে গেলো । দ্বাদশীর চাঁদের আলোয় ধীরে ধীরে ফুটে
উঠতে লাগলো ভি আকৃতির সেলুলার জেলের যন্ত্রণাক্লিষ্ট অবয়ব । অন্ধকারের বুক চিরে
ভেসে এলো প্রাচীন অশ্বথ গাছের গুরু গম্ভির কন্ঠস্বর । আলো ও শব্দের মায়াজাল বোনা
শুরু হল । টের পেলাম, রোমকূপগুলো খাড়া হয়ে গেছে রোমাঞ্চে, উত্তেজনায় ।
টিকিট লাইনে দাঁড়িয়ে কেটে রেখেছে রাজেন্দ্রের লোক । আমরা যেতেই প্রত্যেকের হাতে হাতে ধরিয়ে দিল । লাইন দিয়ে ভিতরে ঢুকে নির্দিষ্ট চেয়ারে বসলাম । সামনে থেকে দুটি জোরালো আলো দর্শকদের দিকে ফেলা হয়েছে। তাই অন্য কিছু নজরে পড়ছে না ।
হঠাত ঝপ করে আলোটা নিভে গেলো । দ্বাদশীর চাঁদের আলোয় ধীরে ধীরে ফুটে
উঠতে লাগলো ভি আকৃতির সেলুলার জেলের যন্ত্রণাক্লিষ্ট অবয়ব । অন্ধকারের বুক চিরে
ভেসে এলো প্রাচীন অশ্বথ গাছের গুরু গম্ভির কন্ঠস্বর । আলো ও শব্দের মায়াজাল বোনা
শুরু হল । টের পেলাম, রোমকূপগুলো খাড়া হয়ে গেছে রোমাঞ্চে, উত্তেজনায় ।
পরের দিন সকালে আবার চললাম সেলুলার জেল । এবার ঘুরে দেখব জেলখানা । আগের সন্ধ্যায়
যে গল্পগুলো শুনেছিলাম লাইট এন্ড সাউন্ড শো-এ, মিলিয়ে দেখে নেব তাও ।
প্রচূর বিদেশি পর্যটক এসেছে । আমাদেরই মত লাইন দিয়ে ভিতরে ঢুকছে । বিষুব রেখার কাছে বলে আন্দামানে গরম ভালোই পড়ে । ঘাম হচ্ছে গল গল করে । বেচারাদের অনেককেই বেশ কাহিল মনে হোল । সাজ পোশাকে বাহুল্য নেই মোটে । হাতের ক্যামেরাগুলো যদিও কামানের মত । যেগুলোর পাশে আমাদের সাধারণ ডিজিটাল ক্যামেরা বড়ই বেমানান ।
বিদেশি পর্যটকদের ভিতরে ঢোকার টিকিটের দাম বেশি । ডলারের হিসেব ।সঙ্গে পাসপোর্ট ভিসার কপি । ভারতীয়দেরও পরিচয়পত্র লাগে টিকিট কাটতে । ক্যামেরার লাগে না । ক্যামেরার টিকিট কি দিশি কি বিদিশি, সব সমান ।
প্রচূর বিদেশি পর্যটক এসেছে । আমাদেরই মত লাইন দিয়ে ভিতরে ঢুকছে । বিষুব রেখার কাছে বলে আন্দামানে গরম ভালোই পড়ে । ঘাম হচ্ছে গল গল করে । বেচারাদের অনেককেই বেশ কাহিল মনে হোল । সাজ পোশাকে বাহুল্য নেই মোটে । হাতের ক্যামেরাগুলো যদিও কামানের মত । যেগুলোর পাশে আমাদের সাধারণ ডিজিটাল ক্যামেরা বড়ই বেমানান ।
বিদেশি পর্যটকদের ভিতরে ঢোকার টিকিটের দাম বেশি । ডলারের হিসেব ।সঙ্গে পাসপোর্ট ভিসার কপি । ভারতীয়দেরও পরিচয়পত্র লাগে টিকিট কাটতে । ক্যামেরার লাগে না । ক্যামেরার টিকিট কি দিশি কি বিদিশি, সব সমান ।
আশিসদার সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার মজা হোল জীবন্ত
উইকিপিডিয়া সঙ্গে নিয়ে চলা । কোথাও যাওয়া হবে শুনলেই, এক গাদা
ভ্রমন পত্রিকা থেকে কেটে, নেট ঘেঁটে, ব্লগ
ডাউনলোড করে, পুরো একটা ফাইল বানিয়ে ফেলে । তারপর সেই ফাইল
মিলিয়ে দ্রষ্টব্য স্থান ঘুরে দেখা হয় ।
সেই আশিসদা যখন শুভদার এক কথায়, সেলুলার জেলে ঢুকতে গিয়ে, একজন গাইড ঠিক করে ফেলল, তখনই বুঝলাম, ব্যাপার গুরুতর । নইলে কোন দিন শুনেছেন, ৬ মাস আগে প্লেনের টিকিট কেটে, বিদেশ বিভুঁয়ে কোথাও, কেউ বেড়াতে গেছেন, হোটেল বুক না করে ? আমরা কিন্তু ঠিক তাই করে থাকি । বলা বাহুল্য ওই আশিসদার বুদ্ধিতে । আন্দামানেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি ।
ওর যুক্তি অকাট্য, প্লেন বা জাহাজের সিট যখন নির্দিষ্ট, তখন সেই হিসাবের হোটেল ঘর নিশ্চয়ই আছে আন্দামানে । তাই আগে থেকে হোটেল বুক করা না করা সমান । বরং আন্দাজে ঢিল না ছুঁড়ে, দেখে শুনে ঠিকঠাক হোটেল বুক করাই বুদ্ধিমানের । তাই... । সত্যি, হোটেলটা ভালোই পেয়েছি শেষ মেশ ।
সেই আশিসদা যখন শুভদার এক কথায়, সেলুলার জেলে ঢুকতে গিয়ে, একজন গাইড ঠিক করে ফেলল, তখনই বুঝলাম, ব্যাপার গুরুতর । নইলে কোন দিন শুনেছেন, ৬ মাস আগে প্লেনের টিকিট কেটে, বিদেশ বিভুঁয়ে কোথাও, কেউ বেড়াতে গেছেন, হোটেল বুক না করে ? আমরা কিন্তু ঠিক তাই করে থাকি । বলা বাহুল্য ওই আশিসদার বুদ্ধিতে । আন্দামানেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি ।
ওর যুক্তি অকাট্য, প্লেন বা জাহাজের সিট যখন নির্দিষ্ট, তখন সেই হিসাবের হোটেল ঘর নিশ্চয়ই আছে আন্দামানে । তাই আগে থেকে হোটেল বুক করা না করা সমান । বরং আন্দাজে ঢিল না ছুঁড়ে, দেখে শুনে ঠিকঠাক হোটেল বুক করাই বুদ্ধিমানের । তাই... । সত্যি, হোটেলটা ভালোই পেয়েছি শেষ মেশ ।
জেলের লোহার ফটক ঠেলে ভেতরে ঢোকার মুখে এক প্রস্থ চেকিং হল । রীতিমত কড়া চেকিং । গতকাল এয়ারপোর্টে নেমে থেকেই লক্ষ্য করছি, পরিচয়পত্র অনেক বার দেখাতে হচ্ছে এখানে । মাঝে মাঝে সন্দেহ হচ্ছে, আন্দামান ভারতেই তো !
যাই হোক, ঢুকে পড়লাম জেলখানায় । জীবনে প্রথমবার । গাইড শের সিং বৈদ, নিজের পরিচয় দিয়ে জানালেন, তাঁর বাবা হিন্দু মা ক্রিশ্চান । ঠাকুর্দা পরাধীন ভারতের পঞ্জাব প্রদেশে থাকতেন । জাতিতে কবিরাজ । ওর ভাষায় বয়েদ, মনে বৈদ্য । স্বাধীনতার লড়াইয়ে সাজা প্রাপ্ত হয়ে এই জেলে দু'বছরের জন্য বন্দি ছিলেন । মুক্তি পেয়ে আর দেশে ফিরে যাননি ।
এইভাবে অনেককেই এখানে বন্দি হিসাবে আনা হয়েছিল । কিন্তু সাজা শেষে
দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোন ব্যবস্থা না থাকায়, এই দ্বীপে রয়ে যেতে বাধ্য
হন । এখানেই জঙ্গল কেটে ঘর বানান । চাষের জমি তৈরি করেন । বিয়ে করে সংসার পাতেন । কিন্তু সেসময়
নিজ নিজ ধর্মের যথেষ্ট সংখ্যক নারী-পুরুষ না থাকায় অন্য ধর্মে বিয়ে সাদি করা ছাড়া
উপায় ছিল না তাদের । সেই থেকেই আন্দামানে বাবা ক্রিশ্চান মা মুসলমান, বা,
মা হিন্দু বাবা শিখ, এরকম প্রচুর মানুষ আছেন ।
বস্তুত আন্দামানিরা সবাই, সব ধর্মাবলম্বী । কেউ থার্ড,
কেউ ফোর্থ জেনারেশন আছেন এখানে । সবাই এই দ্বীপভূমিকে প্রাণ দিয়ে
ভাল বাসেন । দু’হাত দিয়ে রক্ষা করেন ।
মনে পড়ল, কাল রাজেন্দ্রও এই রকমই কিছু একটা বলছিল যেন । তখন বিশ্বাস করিনি । কিন্তু এখন সের সিং-এর কথা শুনে অবিশ্বাস করতে মন চাইছে না ।
মনে পড়ল, কাল রাজেন্দ্রও এই রকমই কিছু একটা বলছিল যেন । তখন বিশ্বাস করিনি । কিন্তু এখন সের সিং-এর কথা শুনে অবিশ্বাস করতে মন চাইছে না ।
এক সময় কালাপানি বলতে গোটা আন্দামানকেই বোঝাতো । আলাদা করে কোন
কয়েদখানা ছিল না । ব্রিটিশ সরকারের বিচারে 'খতরনাক' বন্দিকে নিয়ে এসে এই
জঙ্গল পাহাড়ের মৃত্যু-দ্বীপে ছেড়ে দেওয়া হত । পালাতে গেলেও, খুব
কম করে, সাড়ে ৪০০ মাইল সাঁতরে পেরোতে হবে উত্তাল সমুদ্র । তবেই
মিলবে সব চেয়ে নিকটের মায়নামার উপকূল ।
১৯১০ সালে ওই বন্দিদের দিয়েই তৈরি করা হয় এই জেলখানা । মূলত স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবি নেতা কর্মীদের শাস্তি দেওয়ার জন্যই । যার স্থাপত্য কর্মও দেখার মত ।
তিন তলা জেলখানা, স্টার ফিশ বা ফুলের মত ছড়ানো । মাঝখানে ঘন্টা ঘর কাম ওয়াচ টাওয়ার । এটি চার তলা । যেখানে এসে সাতটা ব্লক এক বিন্দুতে মিশেছে । এক ব্লক থেকে আরেক ব্লকে যেতে গেলে এই ঘন্টা ঘর দিয়েই যেতে হয় । প্রতিটা ব্লকের ডিজাইনও একরকম । একটেরে লম্বা বারান্দার এক পাশে, সার দিয়ে কুঠুরি বা সেল । প্রতিটি সেলের আয়তন ৯ ফুট বাই ১৫ ফুট । একটি মাত্র লোহার গরাদের দরজা, বারান্দার দিকে । অপর দিকে অনেক উঁচুতে একটা ছোট্ট আলো আসার জানালা ।
মজার ব্যাপার হল, প্রতিটি ব্লকেরই বারান্দা ও সেলের পারস্পরিক অবস্থান এক । বারান্দা-সেল, আবার বারান্দা-সেল, আবার বারান্দা-সেল । অর্থাৎ কোন ব্লকের বারান্দা থেকেই অন্য কোন ব্লকের বারান্দা বা সেলের দরজা দেখার উপায় নেই । কুঠুরির গরাদ ধরে দাঁড়ালে, নজরে পড়ে খালি পাশের ব্লকের খাড়া উঁচু দেয়াল আর ঘুলঘুলি । সের সিং বললেন, এক জন বন্দি যাতে কোন ভাবেই অন্য বন্দিকে দেখতে বা পরামর্শ করতে না পারে, তাই এই ব্যবস্থা ।
মোট ৬৯৮ টি কুঠুরি । একটি কুঠুরি বা সেল একজন বন্দির জন্য বরাদ্দ । সেই জন্যই এর নাম সেলুলার জেল । যার মধ্যে ফাঁসি ঘর সংলগ্ন ব্লকে রাখা হত সবচেয়ে বিপজ্জনক বন্দিদের । বীর সাভারকর, উল্লাসকর দত্ত সহ বহু বিপ্লবি ছিলেন এই শ্রেণীর । তাঁদের নামাঙ্কিত সেলগুলি এখন দর্শনার্থীদের কাছে তীর্থস্থান । ফাঁসি ঘরের খুব কাছেই ছিল খাবার ঘরের অবস্থান । স্বাধীনতা সংগ্রামি বিপ্লবিদের মনোবল ভেঙ্গে দেওয়ার জন্যই ।
অত্যাচারও চলত অকথ্য । মূলত গভীর রাতে ঘন্টা ঘরে ধরে নিয়ে এসে অত্যাচার করা হত 'বে-আদব' বন্দির উপর । আর সেই অত্যাচারিতের আর্তচিৎকার অন্ধকারের আবরণ ছিঁড়ে, ছড়িয়ে পড়ত প্রতিটা ব্লকে ব্লকে । বঙ্গোপসাগরের বুকে, প্রকৃতির নিজস্ব খেয়ালে জেগে ওঠা, ৫৭২ টি সবুজ পান্নার নেকলেসের আকৃতির, আন্দামান দ্বীপ পুঞ্জের চারদিকে নাচতে থাকা সাদা ঢেউয়ের উপর, অবিরাম আছড়ে পড়া, উথাল পাথাল হাওয়ার দীর্ঘশ্বাস, আরো ভারী হয়ে উঠত সে আর্তনাদে ।
১৯১০ সালে ওই বন্দিদের দিয়েই তৈরি করা হয় এই জেলখানা । মূলত স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবি নেতা কর্মীদের শাস্তি দেওয়ার জন্যই । যার স্থাপত্য কর্মও দেখার মত ।
তিন তলা জেলখানা, স্টার ফিশ বা ফুলের মত ছড়ানো । মাঝখানে ঘন্টা ঘর কাম ওয়াচ টাওয়ার । এটি চার তলা । যেখানে এসে সাতটা ব্লক এক বিন্দুতে মিশেছে । এক ব্লক থেকে আরেক ব্লকে যেতে গেলে এই ঘন্টা ঘর দিয়েই যেতে হয় । প্রতিটা ব্লকের ডিজাইনও একরকম । একটেরে লম্বা বারান্দার এক পাশে, সার দিয়ে কুঠুরি বা সেল । প্রতিটি সেলের আয়তন ৯ ফুট বাই ১৫ ফুট । একটি মাত্র লোহার গরাদের দরজা, বারান্দার দিকে । অপর দিকে অনেক উঁচুতে একটা ছোট্ট আলো আসার জানালা ।
মজার ব্যাপার হল, প্রতিটি ব্লকেরই বারান্দা ও সেলের পারস্পরিক অবস্থান এক । বারান্দা-সেল, আবার বারান্দা-সেল, আবার বারান্দা-সেল । অর্থাৎ কোন ব্লকের বারান্দা থেকেই অন্য কোন ব্লকের বারান্দা বা সেলের দরজা দেখার উপায় নেই । কুঠুরির গরাদ ধরে দাঁড়ালে, নজরে পড়ে খালি পাশের ব্লকের খাড়া উঁচু দেয়াল আর ঘুলঘুলি । সের সিং বললেন, এক জন বন্দি যাতে কোন ভাবেই অন্য বন্দিকে দেখতে বা পরামর্শ করতে না পারে, তাই এই ব্যবস্থা ।
মোট ৬৯৮ টি কুঠুরি । একটি কুঠুরি বা সেল একজন বন্দির জন্য বরাদ্দ । সেই জন্যই এর নাম সেলুলার জেল । যার মধ্যে ফাঁসি ঘর সংলগ্ন ব্লকে রাখা হত সবচেয়ে বিপজ্জনক বন্দিদের । বীর সাভারকর, উল্লাসকর দত্ত সহ বহু বিপ্লবি ছিলেন এই শ্রেণীর । তাঁদের নামাঙ্কিত সেলগুলি এখন দর্শনার্থীদের কাছে তীর্থস্থান । ফাঁসি ঘরের খুব কাছেই ছিল খাবার ঘরের অবস্থান । স্বাধীনতা সংগ্রামি বিপ্লবিদের মনোবল ভেঙ্গে দেওয়ার জন্যই ।
অত্যাচারও চলত অকথ্য । মূলত গভীর রাতে ঘন্টা ঘরে ধরে নিয়ে এসে অত্যাচার করা হত 'বে-আদব' বন্দির উপর । আর সেই অত্যাচারিতের আর্তচিৎকার অন্ধকারের আবরণ ছিঁড়ে, ছড়িয়ে পড়ত প্রতিটা ব্লকে ব্লকে । বঙ্গোপসাগরের বুকে, প্রকৃতির নিজস্ব খেয়ালে জেগে ওঠা, ৫৭২ টি সবুজ পান্নার নেকলেসের আকৃতির, আন্দামান দ্বীপ পুঞ্জের চারদিকে নাচতে থাকা সাদা ঢেউয়ের উপর, অবিরাম আছড়ে পড়া, উথাল পাথাল হাওয়ার দীর্ঘশ্বাস, আরো ভারী হয়ে উঠত সে আর্তনাদে ।
শুনতে শুনতে আমাদেরই মন ভারী হয়ে আসছিল । রোদে গরমে শরীর থেকে ঘামও
ঝরছিল গল গল করে । অমানুষিক এই অত্যাচারের কাহিনী শুনতে আর ভালও লাগছিল না । শরীর
অস্থির করছিল । বাইরে বেরিয়ে এলাম । গেটের সামনেই বড় বড় ডাব বিক্রি হচ্ছে । জল
শাঁস সবই অত্যন্ত মিষ্টি । খেয়ে প্রাণ জুড়িয়ে গেলো ।
নারকেল গাছের ছড়াছড়ি এখানে । স্বাদ তো ভাল হবেই । শুনলাম সারা
ভারতের নারকেল যায় এখান থেকে । বিশেষ করে নারকেল তেল কোম্পানি গুলো জাহাজ ভরে
নারকেল কিনে নিয়ে যায় । কেউ এখানেই কারখানা বসিয়েছে । ডাব তাহলে নিশ্চয়ই খুব সস্তা
হবে ! ও হরি,
দাম বলে কুড়ি টাকা পিস ।- কেন গো, এত দাম কেন ? আমাদের ওখানেও তো এমনই দাম ডাবের । এখানে তো সস্তা হওয়া উচিত ।
শুভদার প্রশ্ন ।
উত্তরে এক গাল হাসি সহ ডাব বিক্রেতার উক্তি,
- আফনে যদি গাছে উইঠ্যা পাইড়া লন, তয় এক পয়সা লাগব না । আমরা তো খালি গাছে চাপনের আর কাইট্যা দেওনের পয়সা নিতাছি । ডাব তো এহানে ফিরি ।
বুঝলাম, পুর্ব বঙ্গীয় উদবাস্তু মানুষ জনও আছেন এই দ্বীপে ।
আর খাদ্য বস্তু কোন কিছুই এখানে সস্তা নয় । বরং মহার্ঘই বলা চলে । কিন্তু কারণ কী ?
বেলা কম হয়নি । প্রায় একটা বাজে । লাঞ্চ খেয়ে নিলেই হয় । কিন্তু এক পেট ডাবের জল, সঙ্গে পুরু মিষ্টি শাঁস খেয়ে সবার পেট ভরে গেছে । এখুনি দুপুরের খাবার খাওয়া মুশকিল । ছেলেগুলোও খেতে চাইছে না । বলছে, আরেকটু পরে । ঠিক হল, চ্যাথাম স' মিল দেখে তারপর খাওয়া ।
বেলা কম হয়নি । প্রায় একটা বাজে । লাঞ্চ খেয়ে নিলেই হয় । কিন্তু এক পেট ডাবের জল, সঙ্গে পুরু মিষ্টি শাঁস খেয়ে সবার পেট ভরে গেছে । এখুনি দুপুরের খাবার খাওয়া মুশকিল । ছেলেগুলোও খেতে চাইছে না । বলছে, আরেকটু পরে । ঠিক হল, চ্যাথাম স' মিল দেখে তারপর খাওয়া ।
রাজেন্দ্র আজ অন্য একটা ছেলেকে
পাঠিয়েছে গাড়ি দিয়ে । এ' ছেলেটির নাম রাজু । মিনমিন করে ও
যেন কি একটা বলতে যাচ্ছিল । আমরা পাত্তা দিলাম না । হই হই করে আবার গাড়িতে চাপা হল
। চল চ্যাথাম ।
ডাব খেয়ে অনেক ফুরফুরে লাগছে । মনের উপর ভারী পাথরের মত চেপে বসা, সেলুলার জেলের অত্যাচারের কাহিনী, এরই মধ্যে অনেকটা ফিকে হতে লেগেছে । মানুষের মন । সব কষ্ট ভুলে যাওয়ার অসীম শক্তি ধরে । ছেলেরা ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত । কার কোন ছবিটা ভাল উঠেছে, কে কোনটা ঠিকঠাক তুলতে পারেনি, এই নিয়ে গভীর পর্যালোচনা চলছে । মহিলারা হিসাব করতে লেগেছেন, অশ্বথ গাছের নীচে যে অমর জ্যোতিটা জ্বলছে, তার জন্য মাসে কতগুলো গ্যাস সিলিন্ডার লাগে ।
ইন্ডিয়ান অয়েল, সারা বছর, ওই সব সিলিন্ডার বিনা পয়সায় দেয় শুনে, ঘরণীদের নিজ নিজ রসুই ঘরের কথা মনে পড়ে গেছে । অনতি বিলম্বে আলোচনা যে তাঁদের বর ও সন্তানের দিকে ঘুরে যাবে, বাজি লাগিয়ে বলতে পারি । আশিসদা ফাইল খুলে শুভদাকে চ্যাথাম স'মিলের বিশেষত্ব বোঝাতে লেগেছে । এশিয়ার সর্ব বৃহৎ কাঠ চেরাই কারখানা । বিশ্ব যুদ্ধের সময় নাকি জাপানিরা বোমা ফেলেছিল এখানে ।
ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে আমি সবই শুনছি । আর মনে মনে নিজেকে বলছি, আশিসদার
জোরাজুরিতে ভাগ্যিস এলাম । নইলে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের একটা বড় অংশ অজানাই
থেকে যেত চিরকাল ।
কাঠ চেরাই কারখানা দেখতেও টিকিট লাগবে শুনে বেশ রাগই হল । তবু, গাড়ি
হাঁকিয়ে উল্টো পথে এতদুর যখন এলাম, তখন চল দেখাই যাক । বলতে
বলতে ছোট গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম । সিকিউরিটি চেকিং এখানেও বেশ কড়া । জ্বালাতন ।
ভেতরে ঢুকে যদিও আস্তে আস্তে, অবাক হওয়ার
অনুভূতিটা ফিরে এল । বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গড়ে উঠেছে এই কারখানা ।
সিঙ্গুরের মত হাজার একর যদি নাও হয়, চার পাঁচশো একর তো হবেই
। পুরোটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা । সামনের দিকে অফিস, গেস্ট হাউস,
শো রুম, ইত্যাদি । একটু এগোলে ওয়ার্কশপ ।
প্রায় হাজার খানেক লোক কাজ করেন এখানে । কাঠের যাবতীয় আসবাবপত্র তৈরি হয় । জাহাজে
করে সারা পৃথিবী পাড়ি দেয় এখানকার কাঠ ও কাঠের ফার্নিচার । পাদক কাঠের তৈরি সেসব
আসবাবের পালিশ এবং গঠন শৈলীই আলাদা । তার কাছে আমাদের অতি প্রিয় সেগুন কাঠ কোথায়
লাগে ?
আরেকটু এগোতেই কাঠ চেরাইয়ের কল । বিশাল বিশাল । রকম বেরকম । কোনটায় করাতটা তিরিশ ফুট উঁচু থেকে খাড়া নেমে আসছে । আট দশ ফুট ডায়মিটারের গর্জন গাছের গুঁড়িকে চিরতে । আবার কোথাও ওই সাইজের করাতটাই মাটির সঙ্গে সমান্তরালে চলছে, বিশাল বিশাল পাটা তৈরি করতে । কাঠের পাটা তো নয়, যেন ব্যাডমিন্টন কোর্ট । অবাক না হয়ে উপায় আছে ?
আরেকটু এগোতেই কাঠ চেরাইয়ের কল । বিশাল বিশাল । রকম বেরকম । কোনটায় করাতটা তিরিশ ফুট উঁচু থেকে খাড়া নেমে আসছে । আট দশ ফুট ডায়মিটারের গর্জন গাছের গুঁড়িকে চিরতে । আবার কোথাও ওই সাইজের করাতটাই মাটির সঙ্গে সমান্তরালে চলছে, বিশাল বিশাল পাটা তৈরি করতে । কাঠের পাটা তো নয়, যেন ব্যাডমিন্টন কোর্ট । অবাক না হয়ে উপায় আছে ?
এরই লাগোয়া কাঠ রাখার গুদাম । কোথাও কাঠের কাটা টুকরো, পাটা
রাখা আছে, তো কোথাও শুধুই বড় বড় কাঠের গুঁড়ি । বিশাল বিশাল
সে সব কাঠের গুঁড়ি সরানোর কাজ করে ট্রেনিং প্রাপ্ত হাতি আর ইলেকট্রিক ট্রলি । গোটা
চত্বরেই সেই জন্য রেলের ন্যারো গেজ ট্র্যাক পাতা আছে । ওই ট্র্যাক বরাবর ট্রলি
চেপে গিয়ে, বিশাল ৫০-৬০ ফুট লম্বা, আট
দশ ফুট ব্যাসের পাদক গুঁড়ি, জাহাজে ওঠে ।
চ্যাথাম স'মিলের নিজস্ব জাহাজ বন্দর আছে । মালবাহি জাহাজের যদিও । চ্যাথাম হারবার । শুনলাম, পোর্ট ব্লেয়ারের বেশিরভাগ মাল এই বন্দর দিয়েই ওঠা নামা করে ।
পুরোটা হাঁটা গেল না । এখানকার সমস্ত কর্মীর কোয়ার্টারও আছে এই চৌহদ্দির মধ্যে । আর আছে জাপানি বোমার সেই প্রাচীন স্মৃতি চিহ্ন । ৬০-৭০ ফুট ব্যাসের এক গোলাকার বাটির ন্যায় গর্ত । বৃষ্টির জল জমে যাকে পুকুর বলে ভ্রম হয় । দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়, আকাশ থেকে পড়া এই বোমা, আন্দামানে বৃটিশ রাজত্বের অবসান ঘটিয়েছিল ।
১৯৪৭ এর ১৫ আগস্ট ইংরেজ ভারত ছেড়েছিল বটে, কিন্তু তার অনেক আগেই আন্দামান থেকে ইংরেজদের পাততাড়ি গুটিয়ে গেছিলো আজাদ হিন্দ ফৌজের দাপটে ।
চ্যাথাম স'মিলের নিজস্ব জাহাজ বন্দর আছে । মালবাহি জাহাজের যদিও । চ্যাথাম হারবার । শুনলাম, পোর্ট ব্লেয়ারের বেশিরভাগ মাল এই বন্দর দিয়েই ওঠা নামা করে ।
পুরোটা হাঁটা গেল না । এখানকার সমস্ত কর্মীর কোয়ার্টারও আছে এই চৌহদ্দির মধ্যে । আর আছে জাপানি বোমার সেই প্রাচীন স্মৃতি চিহ্ন । ৬০-৭০ ফুট ব্যাসের এক গোলাকার বাটির ন্যায় গর্ত । বৃষ্টির জল জমে যাকে পুকুর বলে ভ্রম হয় । দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়, আকাশ থেকে পড়া এই বোমা, আন্দামানে বৃটিশ রাজত্বের অবসান ঘটিয়েছিল ।
১৯৪৭ এর ১৫ আগস্ট ইংরেজ ভারত ছেড়েছিল বটে, কিন্তু তার অনেক আগেই আন্দামান থেকে ইংরেজদের পাততাড়ি গুটিয়ে গেছিলো আজাদ হিন্দ ফৌজের দাপটে ।
আম আন্দামানির কাছে এখনো দেশের প্রকৃত নেতা সুভাষ চন্দ্র বোস । গান্ধীকে মোটে পছন্দ করে না তারা, মহাত্মার ওই নরম অহিংস মানসিকতার জন্য । আর জহরলালকে মনে করে বিশ্বাসঘাতক ।দেশের নেতা হওয়ার কোন যোগ্যতাই নাকি নেহেরুর ছিল না ।
সাড়ে তিনটে বাজে । পেটে এবার শুধু ইঁদুর নয়, তার
পিছু পিছু বিড়াল কুকুরও দৌড়াচ্ছে । আকাশ কালো করে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি শুরু হল ।
আমাদের অবশ্য অসুবিধা নেই । আশিসদার পরামর্শে ছাতা আমাদের সঙ্গেই আছে । আগেই
বলেছিল, ''বৃষ্টি পড়ে ওখানে বারো মাস......'', ছাতা নিতে ভুলো না যেন । মাথায় দিয়ে বাইরে এলাম ।
রাজু ব্যাটাচ্ছেলে কোথায় গেলো ? একটু খোঁজা খুঁজি করতেই দেখা পাওয়া গেলো বটে । কিন্তু তার কথা শুনে মাথায় বাজ পড়ল । জোয়ার এসেছে । পোর্ট ব্লেয়ার ফেরার রাস্তা বন্ধ । আরো ঘন্টা দেড়েক পরে গেট খুলবে ।
.........মানে ?
মানে, পোর্টব্লেয়ার সংলগ্ন, চ্যাথাম একটা আস্ত দ্বীপ । মাঝখানে ৫০-৬০ ফুটের ছোট্ট একটা ব্রিজ দিয়ে জোড়া । ব্রিজের উপর মসৃণ পিচের রাস্তা দেখে বোঝার উপায় নেই, জোয়ার এলে ওই রাস্তা দু'ভাগ হয়ে উর্দ্ধবাহু নৃত্য শুরু করে ।
না, ভুল বললাম, নৃত্য করে বঙ্গোপসাগরের নীল জল । আর সমস্ত প্রকৃতি তা দেখে আনন্দে করতালি দেয় । এই দুর্গম দ্বীপভূমির আসল রাজা তো ওই লবনাক্ত জলরাশি । তাকে অবজ্ঞা করে এমন সাধ্যি কার ?
রাজুকে বললাম,
- এই সব ঝামেলার কথা তুমি আগে জানতে না ?
ও বলল,
- ম্যায়নে বোলনে কা কোশিস কিয়া থা সাব, আপনে শুনা কঁহা ।
বুঝলাম, মিনমিন করে ও তখন এটাই বলতে চাইছিল । আমরা পাত্তা দিইনি ।
এখন কী করা ? চ্যাথাম দ্বীপে কোন দোকান পাট নেই । লোকালয়ই নেই, তো দোকান পাট । গেটের কাছে একটা মাত্র চায়ের দোকান । কর্মিরা চা বিস্কুট কিনে খায় । চারটে বয়ামে চার রকম বেকারির বিস্কুট । তাই খেলাম সবাই, যে য'টা পারলো । আর চা । আন্দামানে দ্বিতীয় দিন দুপুরের লাঞ্চ । মন্দ নয়, কী বলেন ?
রাজু ব্যাটাচ্ছেলে কোথায় গেলো ? একটু খোঁজা খুঁজি করতেই দেখা পাওয়া গেলো বটে । কিন্তু তার কথা শুনে মাথায় বাজ পড়ল । জোয়ার এসেছে । পোর্ট ব্লেয়ার ফেরার রাস্তা বন্ধ । আরো ঘন্টা দেড়েক পরে গেট খুলবে ।
.........মানে ?
মানে, পোর্টব্লেয়ার সংলগ্ন, চ্যাথাম একটা আস্ত দ্বীপ । মাঝখানে ৫০-৬০ ফুটের ছোট্ট একটা ব্রিজ দিয়ে জোড়া । ব্রিজের উপর মসৃণ পিচের রাস্তা দেখে বোঝার উপায় নেই, জোয়ার এলে ওই রাস্তা দু'ভাগ হয়ে উর্দ্ধবাহু নৃত্য শুরু করে ।
না, ভুল বললাম, নৃত্য করে বঙ্গোপসাগরের নীল জল । আর সমস্ত প্রকৃতি তা দেখে আনন্দে করতালি দেয় । এই দুর্গম দ্বীপভূমির আসল রাজা তো ওই লবনাক্ত জলরাশি । তাকে অবজ্ঞা করে এমন সাধ্যি কার ?
রাজুকে বললাম,
- এই সব ঝামেলার কথা তুমি আগে জানতে না ?
ও বলল,
- ম্যায়নে বোলনে কা কোশিস কিয়া থা সাব, আপনে শুনা কঁহা ।
বুঝলাম, মিনমিন করে ও তখন এটাই বলতে চাইছিল । আমরা পাত্তা দিইনি ।
এখন কী করা ? চ্যাথাম দ্বীপে কোন দোকান পাট নেই । লোকালয়ই নেই, তো দোকান পাট । গেটের কাছে একটা মাত্র চায়ের দোকান । কর্মিরা চা বিস্কুট কিনে খায় । চারটে বয়ামে চার রকম বেকারির বিস্কুট । তাই খেলাম সবাই, যে য'টা পারলো । আর চা । আন্দামানে দ্বিতীয় দিন দুপুরের লাঞ্চ । মন্দ নয়, কী বলেন ?
'' বৃষ্টি পড়ে এখানে বারো মাস,
এখানে মেঘ গাভীর মত .......''
শক্তি চাটুজ্যের এত প্রিয় কবিতাটা যে এত বেয়াক্কেলে লাগবে, কোন দিন দুঃস্বপ্নে ভাবিনি । বেড়াতে গিয়ে বৃষ্টি কার ভাল লাগে বলুন । শক্তির আর কী ? কবি মানুষ । তিনি তো লিখে দিয়েই খালাস । মরতে তো হয় আমাদের । যত অ-কবিদের ।সেবার লাভা-লোলেগাও-পেলিং গিয়েও বৃষ্টি আমাদের ধাওয়া করেছিল । পুরো ট্যুরটা মাটি হয়ে গেছিলো । মনে আছে, রিশপের হোটেলে দু'রাত তিন দিন, আমরা শুধু ব্যালকনিতে বসে, বৃষ্টি দেখে কাটিয়েছিলাম । কোথাও বেরোতে পর্য্যন্ত পারিনি । আন্দামানেও সেই গল্প আরম্ভ হল কিনা বলাবলি করছি, আশিসদা বলল,
- কিচ্ছু চিন্তা কোর না । বৃষ্টি এখুনি থেমে যাবে । রিশপে সেবার তোমরা আমাদের তো নিয়ে যাওনি । অন্য কোন গ্রুপের সঙ্গে জানি গেছিলে । তাই বৃষ্টিতে নাজেহাল হয়েছিলে । এবার আমি সঙ্গে আছি । আর আছে আমার বিখ্যাত কপাল । বৃষ্টি থামল বলে ।
আমাদের পরের গন্তব্য কোভে বিচ । সত্যিই কিছুক্ষনের মধ্যে আকাশ
পরিষ্কার হয়ে এল । মেঘ কেটে একটা দুটো করে তারা ফুটতে লাগলো । শুকতারা, ধ্রুবতারা,
লুব্ধক...... । ত্রয়োদশীর চাঁদ উঠে পড়ল পুব আকাশে । কিন্তু এত
তাড়াতাড়ি অন্ধকার নেমে আসে নাকি এখানে ? সবে তো পোনে ছটা
বাজে । এখনো অনেকক্ষণ সুর্যের আলোর রেশ থাকার কথা আকাশে । নাকি মেঘ পুরোটা কাটেনি
এখনো ? ব্যাপারটা খেয়াল করতে হবে তো ।
চ্যাথামের রাস্তা খুলে যেতেই আমাদের গাড়ি ছুটল কোভে বিচের দিকে ।
টানা দশ-বারো কিলোমিটার পথ, পুরোটাই সমুদ্রের ধার ঘেঁষে । অপূর্ব সুন্দর ।
মসৃণ, খরিশ সাপের পিঠের মত চকচকে কালো । মাঝে সাদা বর্ডার । যাওয়া
আসার দিক নির্দেশ করছে । বাঁ পাশে, পায়ে চলার ফুটপাথ,
ফুট খানেক উঁচুতে । তারও পরে কংক্রিটের পিলার ও রেলিং, গোটা রাস্তা বরাবর । সমুদ্র ও রাস্তার সীমানা চিহ্নিত ক'রে । রাস্তার ডান দিকে কোথাও ছবির মত দুয়েকটি ঘর, কোথাও
শুধুই পাহাড়, টিলা, গাছপালা ।
সন্ধ্যা নামতেই রাস্তার ধারের নিয়ন ভেপারগুলো সব জ্বলতে লেগেছে । অনেক দূর অবধি নজরে পড়ছে সেই আঁকাবাঁকা তটরেখা । কালো মেয়ের বুকের কাছে নানা বিভঙ্গে দুলতে থাকা একখানি ঝলমলে সোনার হার যেন । মায়াবি এই পথের শেষে কোভে বিচ । দুটো অনুচ্চ পাহাড়ের মাঝে । ছোট্ট, অর্ধ চন্দ্রাকার সাদা বালির তট । নারকেল গাছে ঘেরা । রাতের অন্ধকার দূরে ঠেলে নানা রঙের আলো দিয়ে সাজানো ।
বহু পর্যটক তখনও সমুদ্র স্নানের মজা নিচ্ছেন । স্নানের জন্য আদর্শ এই বিচ । রাতেও যাতে কোন অসুবিধা না হয়, তাই আলো দিয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে গোটা চত্বর । বিদ্যুতের কোন অভাব নেই দেখছি এখানে । কিন্তু এত বিদ্যুতের উৎস কী ? সমুদ্রের ঢেউয়ের শক্তি অবশ্য অফুরান । কিন্তু তা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় বলে তো শুনিনি । .....তাহলে ?
সন্ধ্যা নামতেই রাস্তার ধারের নিয়ন ভেপারগুলো সব জ্বলতে লেগেছে । অনেক দূর অবধি নজরে পড়ছে সেই আঁকাবাঁকা তটরেখা । কালো মেয়ের বুকের কাছে নানা বিভঙ্গে দুলতে থাকা একখানি ঝলমলে সোনার হার যেন । মায়াবি এই পথের শেষে কোভে বিচ । দুটো অনুচ্চ পাহাড়ের মাঝে । ছোট্ট, অর্ধ চন্দ্রাকার সাদা বালির তট । নারকেল গাছে ঘেরা । রাতের অন্ধকার দূরে ঠেলে নানা রঙের আলো দিয়ে সাজানো ।
বহু পর্যটক তখনও সমুদ্র স্নানের মজা নিচ্ছেন । স্নানের জন্য আদর্শ এই বিচ । রাতেও যাতে কোন অসুবিধা না হয়, তাই আলো দিয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে গোটা চত্বর । বিদ্যুতের কোন অভাব নেই দেখছি এখানে । কিন্তু এত বিদ্যুতের উৎস কী ? সমুদ্রের ঢেউয়ের শক্তি অবশ্য অফুরান । কিন্তু তা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় বলে তো শুনিনি । .....তাহলে ?
…
রাতের খাবার খেয়ে একবারে হোটেলে ফিরব । সারা দিন অনেক ধকল গেছে ।
দুপুরের লাঞ্চও হয়নি । সবারই পেটে ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে । রাজুকে বললাম, একটা
পাঞ্জাবি ধাবা পাওয়া যাবে ? তন্দুরি রুটি আর চিকেন খাবো ।
মনে মনে বললাম, কাল দুপুরে-রাতে যে বেঙ্গল রেস্টুরেন্টে
খেলাম, তার রান্না ভাল হলেও দাম গলা কাটা । পাঞ্জাবি ধাবায়
আশা করি তা হবে না । ও কোন কথা না বলে,গাড়ি নিয়ে গিয়ে দাঁড়
করালো অন্য একটা রেস্টুরেন্টের সামনে ।
কাউন্টারে বসে আছেন যিনি তাঁর মাথায় পাগড়ি আছে বটে, কিন্তু আর কিছুই আলাদা মনে হল না । খাবারের মেনু কার্ডটা পর্যন্ত একদম এক । দামও । পরে খেতে খেতে লক্ষ্য করলাম, এই হোটেলে কেউ কেউ হার্ড ড্রিংকসও নিচ্ছে খাবারের সঙ্গে । ধাবার সঙ্গে এ'ব্যাপারে একটা মিল পেলাম । যা কাল বেঙ্গল রেস্টুরেন্টে দেখিনি । মেনু কার্ডের দিকে তাকিয়ে আবিষ্কার করলাম, তুলনায় হার্ড ড্রিংকস সস্তা । বুঝলাম, মদ এখানে ডিউটি ফ্রি । আর প্রতি হোটেলেই বারের লাইসেন্স আছে ।
কাউন্টারে বসে আছেন যিনি তাঁর মাথায় পাগড়ি আছে বটে, কিন্তু আর কিছুই আলাদা মনে হল না । খাবারের মেনু কার্ডটা পর্যন্ত একদম এক । দামও । পরে খেতে খেতে লক্ষ্য করলাম, এই হোটেলে কেউ কেউ হার্ড ড্রিংকসও নিচ্ছে খাবারের সঙ্গে । ধাবার সঙ্গে এ'ব্যাপারে একটা মিল পেলাম । যা কাল বেঙ্গল রেস্টুরেন্টে দেখিনি । মেনু কার্ডের দিকে তাকিয়ে আবিষ্কার করলাম, তুলনায় হার্ড ড্রিংকস সস্তা । বুঝলাম, মদ এখানে ডিউটি ফ্রি । আর প্রতি হোটেলেই বারের লাইসেন্স আছে ।
সন্ধ্যে ছটা বাজতে না বাজতেই বারগুলো ভরে যায় পানার্থীদের ভিড়ে ।
আটটা থেকেই রাস্তাঘাট ফাঁকা হতে শুরু করে । রাত নটার মধ্যে আন্দামানের জনজীবন
প্রায় স্তব্ধ ।
তখন শুধু হাওয়া আর ঢেউয়ের নাচন চলে, ৫৭২ টি দ্বীপের এই আদিম
ভূখন্ডের উপর দিয়ে । যে নৃত্যানুষ্ঠান দেখার জন্য রাত জাগে কেবল অসংখ্য নক্ষত্র
মন্ডলি আর ছায়াপথ । লক্ষ বছর আগে, সেই জুরাসিক যুগ থেকে, এই
নিয়মের অন্যথা হয়নি ।
আধুনিকতার অন্যতম নিদর্শন, নৈশ জীবন,
এখনো এই দ্বীপরাজ্যকে স্পর্শ করতে পারেনি দেখে বড় নিশ্চিন্ত লাগলো ।
আন্দামানে আজ তৃতীয় দিন । আজ রস আইল্যান্ড, ভাইপার
আইল্যান্ড এবং সমুদ্রিকা দেখতে যাবো । সকাল সকাল সবাইকে, একেবারে
চান-টান করে, রেডি হয়ে বেরোতে বলেছে আশিসদা । ফিরব রাতের খাওয়া সেরে । সকালের
ব্রেকফাস্ট বড় ক'রে করতে হবে । সঙ্গে কিছু কেক বিস্কুট নিয়ে
নেব । আর ফল । দুপুরে কোথায় কী পাবো, ঠিক নেই ।
আমাদের জানা অধিকাংশ ট্যুরিস্ট স্পটে খাবারের দোকান থাকেই ।
ইয়ুমথাঙ্গে,
আঠের হাজার ফুট উচ্চতায়, মাইনাস চারের বরফের
মধ্যে, অস্থায়ী মদের দোকানও দেখেছি । এখানে খাবার জলও কিনতে
পাওয়া যাচ্ছে না । হয় ডাব খাও, নয় সমুদ্রের হাওয়া । যত দেখছি
অবাক হওয়ার পরিমান বাড়ছে ।
প্রথম দিন গাড়িতে চাপিয়ে রাজেন্দ্র বলেছিল, আপনারা
মেন ল্যান্ডে থাকেন তো, আপনারা বুঝবেন না । তখন হেসেছিলাম ।
এখন যত সময় যাচ্ছে টের পাচ্ছি, ওর কথাটা কত সত্যি ।
রাজীব গান্ধি ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্স লাগোয়া জেটি থেকে ছোট বোটে
চাপলাম । একেবারে সাধারণ নৌকা । ডিজেল ইঞ্জিন চালিত । ভট ভট শব্দ করে কালো ধোঁয়া
ছেড়ে বোট ছাড়লো । আন্দামানে আমাদের প্রথম জলবিহার ।
বেশ রোমাঞ্চ হচ্ছে । রস আইল্যান্ড দেখতে পাওয়া যাচ্ছে । নারকেল গাছে ঘেরা ছোট্ট দ্বীপ । কত আর দূর ? বড়জোর এক কিলোমিটার । কি তাও না । আরেকটু কাছে গিয়ে নজরে পড়ল, দ্বীপের গায়ে, পাথরের উপর লাল রঙে, বড় বড় ইংরাজি হরফে লেখা, ROSS ISLAND. অনেকটা হলিউডের স্টাইলে । বাঃ, বেশ তো !
বেশ রোমাঞ্চ হচ্ছে । রস আইল্যান্ড দেখতে পাওয়া যাচ্ছে । নারকেল গাছে ঘেরা ছোট্ট দ্বীপ । কত আর দূর ? বড়জোর এক কিলোমিটার । কি তাও না । আরেকটু কাছে গিয়ে নজরে পড়ল, দ্বীপের গায়ে, পাথরের উপর লাল রঙে, বড় বড় ইংরাজি হরফে লেখা, ROSS ISLAND. অনেকটা হলিউডের স্টাইলে । বাঃ, বেশ তো !
আশিসদার রিসার্চ পেপার জানালো, অন্য সব আইল্যান্ডের থেকে,
পদমর্যাদায় একদম আলাদা এই দ্বীপ । এখান থেকেই গোটা আন্দামান শাসন
করত ইংরেজরা । রাজ রক্ত ছাড়া, এই দ্বীপে কারোর প্রবেশ,
কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ । সন্দেহজনক কিছু দেখলেই বন্দুকের গুলি ছুটত,
ধাঁই ধাঁই । ব্লাডি নিগারদের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে, ব্রিটিশ
আভিজাত্য বজায় রেখেছিল এই দ্বীপ, ইংরেজ শাসনের শেষ দিন অবধি
।
মনে মনে বললাম, রস আইল্যান্ড না BOSS ISELAND ?
ক্লাব ঘর, চার্চ, বলরুম, মিটিং হল, রাস্তা এবং অফিসারদের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ
এখনো সযত্নে রক্ষিত আছে, দর্শনার্থীদের জন্য । ইংরেজ স্থাপত্য
কর্মের উপর গজিয়ে উঠেছে কত নাম-না-জানা গাছ । তাদের শিকড় ও ঝুরির প্রাকৃতিক
স্থাপত্য কর্মও দু চোখ ভরে দেখার মত । ছেলেগুলো পাগলের মত ছবি তুলছে । আকাশ ঝকঝকে
নীল । কালকের বৃষ্টির কোন চিহ্ন মাত্র নেই । মাথার উপর রোদ গন গন করছে । আমরা
হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলেছি, আশিসদার নেতৃত্যে । দ্বীপের অপর
প্রান্তে । ওই দিকেই নাকি সুনামি আছড়ে পড়েছিল, বছর কয় আগে ।
এখনো তার বিভৎসতার চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে রস আইল্যান্ড ।
আবার শক্তি চাটুজ্জেকে ধার করি । অপরূপভাবে ভাঙ্গা যে কখনো কখনো সৃষ্টির থেকেও সুন্দর হয়, সুনামিদীর্ণ রস আইল্যান্ডে না এলে তা বুঝতেই পারতাম না । এই রসের জন্যই বেঁচে গেছে পোর্টব্লেয়ার । নাহলে কী যে হত মনে করে এখনো শিউরে ওঠেন স্থানীয় ডাব বিক্রেতা ।
আবার শক্তি চাটুজ্জেকে ধার করি । অপরূপভাবে ভাঙ্গা যে কখনো কখনো সৃষ্টির থেকেও সুন্দর হয়, সুনামিদীর্ণ রস আইল্যান্ডে না এলে তা বুঝতেই পারতাম না । এই রসের জন্যই বেঁচে গেছে পোর্টব্লেয়ার । নাহলে কী যে হত মনে করে এখনো শিউরে ওঠেন স্থানীয় ডাব বিক্রেতা ।
চোখের নিমেষে তর তর ক'রে গাছে উঠে, কাঁদি সমেত ডাব নামিয়ে নিয়ে আসছেন দড়ি বেঁধে । দু'মিনিটেই
মিষ্টি জল ও শাঁস হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন দা দিয়ে কেটে । জিজ্ঞেস করলাম,
- এই গাছগুলি বুঝি আপনার ?
ঘামে ভেজা তেল তেলে কালো মুখে গামছা বুলিয়ে, মুখের ত্রিশ পাটি (উপর পাটির দুটো দাঁত নেই ) বার করে, হেসে ফেললেন । তারপর বললেন,
- গাছ তো এই দ্বীপের । এই দ্বীপ, রস আইল্যান্ড, সরকারের । আর সরকার মানে গোটা আন্দামানটা আমাদের ।
- কিন্তু রোজগার তো আপনি করছেন । কাউকে এজন্য কিছু দিতে হয় না ? কোন লাইসেন্স, ভাড়া, লিজ, পারমিশন, ঘুষ-টুস ......?
- এই গাছগুলি বুঝি আপনার ?
ঘামে ভেজা তেল তেলে কালো মুখে গামছা বুলিয়ে, মুখের ত্রিশ পাটি (উপর পাটির দুটো দাঁত নেই ) বার করে, হেসে ফেললেন । তারপর বললেন,
- গাছ তো এই দ্বীপের । এই দ্বীপ, রস আইল্যান্ড, সরকারের । আর সরকার মানে গোটা আন্দামানটা আমাদের ।
- কিন্তু রোজগার তো আপনি করছেন । কাউকে এজন্য কিছু দিতে হয় না ? কোন লাইসেন্স, ভাড়া, লিজ, পারমিশন, ঘুষ-টুস ......?
আমার প্রশ্নে আবার হেসে ফেলেন বৃদ্ধ । তারপর, কোন
বাচ্চাকে বোঝানোর ঢঙ্গে বলেন,
- কাকে কী দেবো ? কেন ? নারকেল গাছ তো এমনিই হয়ে আছে এখানে । কেউ লাগায়নি । আপনাদের কেটে খাওয়ালাম । না হলে ওমনিই পড়ে থাকে । কাঁকড়ায় খায় । পশু পাখিতে খায় ।
- কাকে কী দেবো ? কেন ? নারকেল গাছ তো এমনিই হয়ে আছে এখানে । কেউ লাগায়নি । আপনাদের কেটে খাওয়ালাম । না হলে ওমনিই পড়ে থাকে । কাঁকড়ায় খায় । পশু পাখিতে খায় ।
........কাঁকড়া ডাব খায় ? কথাটা খট করে কানে বাজলো । কিন্তু আর কথা বাড়াতে সাহস পেলাম না । কী জানি, কোথাকার ডাবের জল কোথায় গড়ায় ! বৃদ্ধের ফোকলা হাসিতেই মালুম হল, আমরা এসব বুঝবো না । মেনে ল্যান্ডে থাকি কিনা ।
গায়ে সাদা ছিট ছিট, মাথায় ফ্যাকড়া শিং, অবিকল
ছবির বই থেকে উঠে আসা চার পাঁচখানা হরিণ ঘুরে বেড়াচ্ছে গোটা চত্বরে । মানুষকে ভয়
নেই ওদের । ডাকলেই আদুরে মেয়ের মতন, গায়ের কাছে চলে আসছে । ডাবের ফেলে দেওয়া শাঁস
খাচ্ছে চেটে পুটে । মাঝে মাঝে কেক বিস্কুটও । আর ছবির পোজ দিচ্ছে, হিরোয়িনের মত । শুনলাম, রাতে এই হরিণগুলোই পাহারা (?)
দেয় এই দ্বীপ । আর কিছু ময়ূর, সাপ, শঙ্খ চিল.... । ইংরেজ প্রভুদের নিজস্ব ভূখন্ডে এখনো কালো মানুষের রাত
কাটানো মানা ।
বড় জোর দেড় কিলোমিটার লম্বা হবে দ্বীপটা । পুরোটা পাক দিলাম আমরা ।
প্রচুর ছবি তোলা হল । সমুদ্রের জল এত পরিষ্কার আর স্বচ্ছ হয় জানাই ছিল না । আমাদের
সমুদ্র তো পুরী বা দীঘা । এর কাছে নর্দমার পাঁক । হালকা নীল স্ফটিক স্বচ্ছ জলের
স্বাদও নিশ্চয়ই আলাদা হবে । ভেবে আঁজলা করে তুলে মুখে দিলাম ।
ও হরি, এও দেখি একই রকম নোনতা । মুখটা বিস্বাদ হয়ে গেলো ।
ও হরি, এও দেখি একই রকম নোনতা । মুখটা বিস্বাদ হয়ে গেলো ।
বুঝলাম, প্রকৃতি সব জায়গাতেই একই রকম অকৃপণ । আমরা,
সভ্য মানুষ (?) তার পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিই । তাই
কোথাও কোথাও তার নাভিশ্বাস ওঠার দশা ।

রস আইল্যান্ড ছেড়ে আসতে মন চাইছিল না । কত ইতিহাস গায়ে জড়িয়ে আজও বুঝি আন্দামানকে শাসন করে চলেছে এই দ্বীপ । সৌন্দর্য্যে, গাম্ভীর্য্যে, স্বমহিমায়, প্রকৃতির নিজস্ব খেয়ালে..........।
হঠাৎ জেটির মাইকে ঘোষণা কানে এল,
- শেষ বোট এম ভি দুর্গা আর পাঁচ মিনিটে রস আইল্যান্ড ছেড়ে যাবে ।
- আঁ, শেষ বোট ? বলে কী ? ছোট, ছোট ।
- শেষ বোট এম ভি দুর্গা আর পাঁচ মিনিটে রস আইল্যান্ড ছেড়ে যাবে ।
- আঁ, শেষ বোট ? বলে কী ? ছোট, ছোট ।
পড়ি মরি করে ছুটলাম বোটের দিকে । বেলা প্রায় দেড়টা বাজে । চার
ঘন্টা সময় কোথা দিয়ে পেরিয়ে গেছে টের পাইনি ।


যত সময় যাচ্ছে, বিস্ময়ের পরিমান বাড়ছে । মাঝে মাঝে সন্দেহ হচ্ছে, আমরা ভারতেই আছি তো ? মানে আন্দামান ভারত বর্ষেরই অঙ্গ তো, না কি ?
আজ একটু আগে যে ঘটনাটার সাক্ষী থাকলাম আমরা, বিশ্বাসই হচ্ছে না সেটা ভারত বর্ষে আমাদের চোখের সামনে ঘটেছে বলে । সেই প্রথম দিন থেকে, '' আপনারা বুঝবেন না '' শব্দবন্ধটি আমাদের তাড়া করে ফিরছে । আর আজ, একটু আগে যেটা হল সেটা তো সত্যিই আমার বোঝার সীমার বাইরে ।

যত সময় যাচ্ছে, বিস্ময়ের পরিমান বাড়ছে । মাঝে মাঝে সন্দেহ হচ্ছে, আমরা ভারতেই আছি তো ? মানে আন্দামান ভারত বর্ষেরই অঙ্গ তো, না কি ?
আজ একটু আগে যে ঘটনাটার সাক্ষী থাকলাম আমরা, বিশ্বাসই হচ্ছে না সেটা ভারত বর্ষে আমাদের চোখের সামনে ঘটেছে বলে । সেই প্রথম দিন থেকে, '' আপনারা বুঝবেন না '' শব্দবন্ধটি আমাদের তাড়া করে ফিরছে । আর আজ, একটু আগে যেটা হল সেটা তো সত্যিই আমার বোঝার সীমার বাইরে ।
শুনেছি, পৃথিবীতে সমস্ত দেশের মধ্যে, ডেনমার্ক ও নিউজিল্যান্ডে নাকি সৎ মানুষের শতকরা হার সবচেয়ে বেশি ।
ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, হল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড প্রভৃতি
দেশগুলিও এই তালিকায় ওপর দিকেই থাকবে । সততা ও দুর্নীতির এই
মাপকাঠিতে আমাদের দেশের স্থান যে শেষের দশে পড়ে, তাও বলেছে ওই সমীক্ষায় ।
আমাদের প্রতি দিনের অভিজ্ঞতাও সে কথাই বলে । চৌরাস্তার মোড়ে, প্রকাশ্য দিবালোকে, হাত তুলে ট্রাকের খালাসির মুঠো
থেকে খুচরো পয়সা নিতে দেখি আমরা ট্রাফিক পুলিশকে । নিত্যি । সেটাই আমাদের চোখে
স্বাভাবিক । তাই আমাদের দেশে, ট্যাক্সিতে কেউ অন্যমনস্ক হয়ে
টাকা বা অন্য দামি জিনিস ফেলে নেমে গেলে সে টাকা আর ফিরে পাওয়া যায় না । খোয়া
যাওয়া টাকা ফেরত দিলে সেই ট্যাক্সি ড্রাইভারের ছবি কাগজে বেরোয় । তার মহানুভবতার,
সততার শংসাপত্র লেখা হয় । যেন কুড়িয়ে পাওয়া অন্যের টাকা আত্মসাৎ
করাটাই স্বাভাবিক । ফেরত দেওয়াটাই অস্বাভাবিক ।
তা অস্বাভাবিক কিছু দেখলে তো চোখ কচলাতে হবেই । আন্দামানে এসে থেকে
এতো বার চোখ কচলাতে হচ্ছে যে চোখ লাল হয়ে গেলো ।
ব্যাপারটা তাহলে খুলেই বলি । আজ আমাদের আন্দামান ভ্রমণের তৃতীয় দিন
। সকালটা রস আইল্যান্ডে দারুণ কাটল । কিন্তু বিকেলে ভাইপার আইল্যান্ড দেখতে গিয়ে মনটা
একেবারে দমে গেলো ।আন্দামানের কোর্ট এবং ফাঁসি ঘর ছিল এখানে । আজ থেকে প্রায় আশি নব্বই বছর আগে, ওই কোর্ট রুমে বৃটিশ জজ সাহেবের ''অর্ডার....অর্ডার'' শোনা যেত হয়ত । এই দ্বীপ রাজ্যের কোন বেয়াদব, আইন ভাঙ্গলে, বৃটিশ শাসকের বিচারে তার ফাঁসি পর্যন্ত হত । ওই টিলার উপরের ফাঁসি ঘরে । কিন্তু সেই অতি সাধারণ প্রশাসনিক কাজ কর্মের স্মৃতি আমাদের কোন কাজে লাগবে ? স্বাধীনতার ইতিহাসেও তার ঠাঁই কোথায় ?
তাছাড়া কোর্ট রুম ব'লে, যে ইঁট সুরকির তৈরি,
খুবই ছোট, অযত্নে পড়ে থাকা, একটি ঘর আমাদের দেখানো হল, তা কোন দাগই কাটতে পারল
না মনে । প্রবল উৎসাহ নিয়ে এক নৌকা লোক ভাইপার আইল্যান্ডে নামল বটে । কিন্তু
অল্পক্ষণের মধ্যেই সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে, দ্রুত বোটে ফিরেও এল । কেউ কেউ আবার (অন্য
দলের) তাদের ট্রাভেল এজেন্টকে ফোন করে গাল দিতে লাগলো, এমন
ভুলভাল জায়গা দেখাতে নিয়ে আসার জন্য ।
আমাদের কোন ট্রাভেল এজেন্ট নেই । আশিসদাই আমাদের ট্যুর প্ল্যানার,
গাইড, টিম ক্যাপটেন । আড়চোখে দেখলাম সে বেশ গম্ভীর হয়ে গেছে ।পূজা বৌদির কাছে মিঠে-কড়া
দুয়েকটি বাক্য শুনেছে বোধহয় । এতটা পথ জল কেটে এসে ''এই বেকার দ্রষ্টব্য''
দর্শন করানোর জন্য । সব দোষ নাকি আশিস দার । কেন সে আগে থেকে সব খবর
ঠিকঠাক নিয়ে রাখেনি ? ইত্যাদি ..প্রভৃতি ।
মহিলাদের এই এক সুবিধা । ব্যর্থতার কোন দায়
তাঁরা কখনই নেন না । ভুল তো শুধু পুরুষই করে, সেই ইতিহাসের
কাল থেকে দেখে আসছি ।
ভাইপার যাওয়ার পথটা কিন্তু রোমাঞ্চকর । অন্তত আমার তো বেশ লাগলো ।
সকালে যে এম ভি দুর্গায় চেপে রস আইল্যান্ড গেছিলাম, অবিকল সেই মাপের বোট ।
ডেকের উপর সার দিয়ে বেঞ্চি পাতা । জনা চল্লিশের বসার ব্যবস্থা হতে পারে । শুনলাম
বোটে প্রায় পঞ্চাশ জন উঠেছে । কি জানি বাবা উল্টে যাবে না তো ! সমুদ্রের জল তো হাত
বাড়িয়ে ছোঁয়া যাচ্ছে । জলের গভীরতা নাকি একশ ফুটেরও বেশি । বড় জাহাজ যেতে পারে এই
নাব্যতায় । বোট উল্টালে আর রক্ষা নেই । ওই কমলা রঙের লাইফ জ্যাকেটের সাধ্য নেই
বাঁচায় । তায় সাঁতার জানি না ।
এইসব উল্টোপাল্টা ভাবনার মাঝেই ভটভট শব্দে ডিজেল ইঞ্জিন চালু হল । প্রায় ঘন্টা খানেকের রাস্তা ভাইপার । সুন্দরবনের খাড়ির মত একটা জলপথ । এদিকে পোর্টব্লেয়ার দ্বীপ, ওদিকে নর্থবে আইল্যান্ড । নর্থবের এই দক্ষিণ দিকটা পুরোটাই নারকেল গাছে মোড়া । অনুচ্চ একটা পাহাড়ের মাথায় একটা লাইট হাউস দেখা যাচ্ছে । লাল সাদা ডোরা কাটা । বোটের পাইলট জানালেন, রস আইল্যান্ড থেকে তোলা, নর্থবের এই লাইট হাউসের ছবিই আছে আমাদের কুড়ি টাকার নোটে । শুনে সবাই পকেট থেকে কুড়ি টাকার নোট বার করে মিলিয়ে নিলাম । সত্যিই অবিকল সেই ছবি, আমাদের সামনে, লাইভ ।
এইসব উল্টোপাল্টা ভাবনার মাঝেই ভটভট শব্দে ডিজেল ইঞ্জিন চালু হল । প্রায় ঘন্টা খানেকের রাস্তা ভাইপার । সুন্দরবনের খাড়ির মত একটা জলপথ । এদিকে পোর্টব্লেয়ার দ্বীপ, ওদিকে নর্থবে আইল্যান্ড । নর্থবের এই দক্ষিণ দিকটা পুরোটাই নারকেল গাছে মোড়া । অনুচ্চ একটা পাহাড়ের মাথায় একটা লাইট হাউস দেখা যাচ্ছে । লাল সাদা ডোরা কাটা । বোটের পাইলট জানালেন, রস আইল্যান্ড থেকে তোলা, নর্থবের এই লাইট হাউসের ছবিই আছে আমাদের কুড়ি টাকার নোটে । শুনে সবাই পকেট থেকে কুড়ি টাকার নোট বার করে মিলিয়ে নিলাম । সত্যিই অবিকল সেই ছবি, আমাদের সামনে, লাইভ ।
রস আইল্যান্ডকে ডান হাতে রেখে আমাদের বোট বাঁদিকের খাঁড়িতে ঢুকল ।
ওই দিকে শুধুই গাছপালা । কিন্তু এদিকে, পোর্টব্লেয়ারের দিকে, একের
পর এক জেটি । রাজীব গান্ধি ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্স জেটি থেকে আমরা বোটে উঠেছি ।
প্রথমেই পেরোলাম ফোনিক্স বে জেটি । তারপর ফিশারিজ জেটি । তারপর চ্যাথাম জেটি । এন
এস আর ওয়াই জেটি । আর, মাঝ সমুদ্রে ফ্লোটিং ড্রাই ডক ।
ভাসমান জেটি । বড় বড় জাহাজ, এই ভাসমান জেটিতে চাপিয়ে রিপেয়ার
করা হয় । রং করা হয় ।
আশিসদা ছেলেগুলোকে বোঝাচ্ছিল, কিভাবে পেটে জল ভরে নিয়ে ওই ভাসমান জেটি প্রথমে সমুদ্রে ডুব দেয় । বড় জাহাজ, যেগুলো ক্রেনে করে তোলা অসম্ভব, সেগুলো তখন ওই জেটির উপরের জলে এসে নোঙ্গর করে । তারপর নিচে ডুবে থাকা জেটির জল পাম্প করে বার ক'রে, সেখানে হাওয়া ভরে দিলেই ভাসমান জেটি আবার উপরে উঠে আসে, পিঠে ওই জাহাজটাকে বসিয়ে । তখন ওই জাহাজ মেরামত করতে কোন অসুবিধাই থাকে না ।
আশিসদা ছেলেগুলোকে বোঝাচ্ছিল, কিভাবে পেটে জল ভরে নিয়ে ওই ভাসমান জেটি প্রথমে সমুদ্রে ডুব দেয় । বড় জাহাজ, যেগুলো ক্রেনে করে তোলা অসম্ভব, সেগুলো তখন ওই জেটির উপরের জলে এসে নোঙ্গর করে । তারপর নিচে ডুবে থাকা জেটির জল পাম্প করে বার ক'রে, সেখানে হাওয়া ভরে দিলেই ভাসমান জেটি আবার উপরে উঠে আসে, পিঠে ওই জাহাজটাকে বসিয়ে । তখন ওই জাহাজ মেরামত করতে কোন অসুবিধাই থাকে না ।
আশিসদার কথা শুধু ছেলেরা নয়, আমরা, বড়রাও শুনছি হাঁ করে ।
আর জীবন্ত উইকিপিডিয়ার ঝুলি থেকে একের পর এক বেড়াল বেরিয়ে আসছে । এন এস আর ওয়াই
জেটি আসলে পোর্টব্লেয়ারের প্রধান বন্দর । কলকাতা বা চেন্নাই থেকে এম ভি হর্ষবর্ধন
বা ওই জাতীয় বড় জাহাজ এই বন্দরেই ভেড়ে । পাশেই আছে ইন্ডিয়ান অয়েলের বিশাল এলাকা ।
জাহাজ বোঝাই করে ডিজেল আসে আন্দামানে । প্রায় প্রতিদিন । লক্ষ লক্ষ লিটার তেল লাগে
আন্দামানের,
রোজ । খনিজ তেলই এই দ্বীপ রাজ্যে যাবতীয় কাজ কর্মের একমাত্র অবলম্বন
। গাড়ি-ঘোড়া জাহাজ-নৌকা তো তেলে চলেই । এমনকি বিদ্যুতও নাকি তৈরি হয় ওই তেল থেকে ।
আশিসদার কথার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তর্কে অবতীর্ণ হব ভাবছি, এমন সময়
তাকে সমর্থন জানিয়ে বোটের পাইলট এগিয়ে এলেন । বললেন, ''আপনি
একদম ঠিক বলেছেন । এখানে তো কয়লা নেই, তাই বিদ্যুৎ তৈরি করার
উপায় নেই । যদিও বিদ্যুৎ পর্ষদ আছে । মিটার আছে, মিটার রিডিং
আছে, বিল আছে, বিল পেমেন্ট আছে । সবই
আছে । খালি বিদ্যুৎ তৈরি হয় জেনারেটারে । ওই সব পাহাড়ের মাথায় বড় বড় জেনারেটর
বসানো আছে । ওগুলোই আমাদের, মানে গোটা আন্দামানের, বিদ্যুতের চাহিদা মেটায় । আপনাদের কাছে অনুরোধ, বিদ্যুতের
অপচয় করবেন না । যে হোটেলেই উঠেছেন, ঘর থেকে বেরোনোর সময় আলো
পাখা সব নিভিয়ে দেবেন দয়া করে । বিদ্যুৎ এখানে সত্যিই মহার্ঘ ।''
অযাচিত এই উপদেশের জন্য তৈরি ছিলাম না মোটেই । সবাই চুপ মেরে গেলাম
। চোখে পড়ল,
সুন্দরবনের মতই খাড়ির ধারে ধারে ঠেস মূল জাতীয় উদ্ভিদও রয়েছে প্রচুর
। কেয়া গাছের ঝোপ বলেই তো মনে হচ্ছে ওগুলোকে । কিন্তু প্রশ্ন করতে ভয় লাগলো । কী
জানি বাবা, কোন খাড়ির জল আবার কোন সমুদ্রে গিয়ে পড়ে ।
ফেরার সময় দেখি আরো একটা খালি বোট এসেছে আমাদের নিয়ে যেতে !
তারমানে সত্যিই বোট ওভার ওয়েট ছিল ? তখন পাশ দিয়ে একটা মালবাহী জাহাজ যাওয়ার সময়
যেভাবে দুলছিল নৌকাটা, মনে হয়েছিল ডুবলাম বুঝি ! সেকথা মনে
পড়তে ভয় আরও জাঁকিয়ে বসল ! কিন্তু এবার আর কিছুই হল না ! অর্ধেক সওয়ারি নিয়ে সাঁ
সাঁ করে ছুটল বোট ! সূর্য ঢলে পড়েছে ভাইপার আইল্যান্ড পাহাড়ের ওপারে ! একটু পরেই
অন্ধকার হয়ে যাবে চরাচর ! পুবদিকে রস আইল্যান্ডের মাথায় বিশাল চাঁদ উঠেছে ! জমিদার
বাড়ির ভাত খাওয়ার বড় কাঁসার থালার মতো ! ঝকঝকে হলুদ, মোহময় !
পূজা বৌদি মনে করালো, আজ কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো ! আজ খিচুড়ি
আর ফুলকফির তরকারি খাওয়ার দিন ! আমার খিচুড়ি প্রীতি তেমন একটা নেই ! কিন্তু আমার
বৌয়ের মুখে মুহূর্তে একটা বিষাদ-রেখা খেলে গেল ! খিচুড়ি বলতে ও এখনও, জাস্ট পাগল (নাকি পাগলি হবে) !
সমুদ্রিকা আর একোরিয়াম, দুটোই প্রায় একই রকম ! দুটোতেই সমুদ্রের
বিভিন্ন মাছ ও প্রাণী জগতের হদিস দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে ! কাচের বাক্সে কিছু
জীবন্ত মাছ,
অক্টোপাস ইত্যাদি ! আমার ও আশিসদার ছেলে দুজনই উত্তেজিত ! গায়ে লাল
নীল রং করা ছোট্ট ছোট্ট এক প্রকার মাছ দেখে ! ওটা নাকি ক্লাউন ফিশ ! নিমো ছবিতে এইরকম
একটা মাছের এডভেঞ্চারের গল্প দেখানো আছে ! তা ভালো ! আমাদের বলিউডে তো কবেই 'হাতি মেরা সাথি' ছবিতে, হাতিকে
দিয়ে কত কী করানো হয়েছে ! এখন হলিউডও সেই রাস্তায় হাঁটছে ! সমুদ্রিকার বাগানে
বিশাল তিমি মাছের কঙ্কাল রাখা ! আর একটা ঘরে বিশাল বিশাল শঙ্খ ও ঝিনুক ! একটা ঘরে
প্রজাপতি, মাকড়সা ইত্যাদি ! জারোয়া ও ওঙ্গিজদের জীবন নিয়ে
আলাদা সংগ্রহশালা আছে এখানে ! অনবদ্য ! সুপার্ব ! স্প্লেনডিড ! আশিসদা যা দেখে
ঘোষণা করে দিল, জারোয়া দ্বীপে আর যাব না আমরা ! আমাদের
জারোয়া দর্শন হয়ে গেল ! কালকের দ্রষ্টব্য, রেড স্কিন
আইল্যান্ড ।
অন্ধকার চিরে আমাদের ট্যাভেরা ছুটে চলেছে । ডিনার সেরে এবার হোটেলে ফেরার তাড়া । রাত বেশি নয় । মাত্রই সাড়ে আটটা । কিন্তু আমরা সারা দিনের ধকলের শেষে যাকে বলে 'ডগ টায়ার্ড' । রাস্তাও শুনসান । গাড়ির সংখ্যা খুবই কম । পায়ে হাঁটা লোকজন প্রায় নেই । হঠাৎ, একটা মোড়ের মাথায় ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষলো রাজু । একটু বোধহয় ঝিমুনি এসে থাকবে । চটকা ভাঙতে তাকিয়ে দেখি, গাড়ির আলোয় দাঁড়িয়ে আছে, এক রোগা ক্ষয়াটে চেহারার পুলিশ কনস্টেবল । হাতে একটা লাঠি আছে বটে, কিন্তু তা দিয়ে কুকুর তাড়ানোও সম্ভব নয় । খাঁকি রঙের মলিন উর্দি খানাই যা 'পুলিশ' 'পুলিশ' । আশে পাশে কেউ কোত্থাও নেই । লাঠি উঁচিয়ে সে ড্রাইভারকে নেমে আসতে বলছে । কেন কে জানে ! রাজুও দেখি ওমনি, গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে, আলো জালিয়ে রেখে নেমে গেলো ।
অন্ধকার চিরে আমাদের ট্যাভেরা ছুটে চলেছে । ডিনার সেরে এবার হোটেলে ফেরার তাড়া । রাত বেশি নয় । মাত্রই সাড়ে আটটা । কিন্তু আমরা সারা দিনের ধকলের শেষে যাকে বলে 'ডগ টায়ার্ড' । রাস্তাও শুনসান । গাড়ির সংখ্যা খুবই কম । পায়ে হাঁটা লোকজন প্রায় নেই । হঠাৎ, একটা মোড়ের মাথায় ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষলো রাজু । একটু বোধহয় ঝিমুনি এসে থাকবে । চটকা ভাঙতে তাকিয়ে দেখি, গাড়ির আলোয় দাঁড়িয়ে আছে, এক রোগা ক্ষয়াটে চেহারার পুলিশ কনস্টেবল । হাতে একটা লাঠি আছে বটে, কিন্তু তা দিয়ে কুকুর তাড়ানোও সম্ভব নয় । খাঁকি রঙের মলিন উর্দি খানাই যা 'পুলিশ' 'পুলিশ' । আশে পাশে কেউ কোত্থাও নেই । লাঠি উঁচিয়ে সে ড্রাইভারকে নেমে আসতে বলছে । কেন কে জানে ! রাজুও দেখি ওমনি, গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে, আলো জালিয়ে রেখে নেমে গেলো ।
হতভম্বর মতো বসে আছি । গাড়ি থেকে নামা ঠিক হবে কিনা বলাবলি করছি ।
বিদেশ বিভুঁই বলে কথা । গাড়ির আলোয় নজরে পড়ছে, সেই ট্রাফিক কনস্টেবল লাঠি
দিয়ে ইঙ্গিত করে গাড়ির সামনে দিকে কিছু একটা দেখাচ্ছে । কী যেন বলছে রাজুকে ।পকেট
থেকে কাগজ বার করে কিছু লিখেও নিল । আর রাজু পিছনে হাত দিয়ে, ক্লাসের সব চেয়ে ভাল ছেলেটির মতন, ঘাড় নেড়ে যাচ্ছে ।
কোন প্রতিবাদ করছে না । ব্যাপারটা কী ? গাড়ির কাগজ, ড্রাইভিং
লাইসেন্স কিছুই তো দেখতে চায়নি । তাহলে ?
প্রায় মিনিট দশেক পরে রাজু ছাড়া পেল । গম্ভীর মুখে চুপ করে এসে
গাড়ি স্টার্ট দিল । তারপর স্বগতোক্তির মত বলল, কাল সে গাড়ি বনধ ।
বুঝলাম গন্ডগোলের কেস । মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,
- কেন গো কী হল ?
উত্তরে ও যা বলল, শুনে আমাদের আকাশ থেকে পড়ার অবস্থা । তিন দিন আগেই ওর গাড়ির বাঁদিকের ডিপার ল্যাম্পটা খারাপ হয়েছে । আমরা যদিও কিছুই বুঝতে পারিনি এতক্ষণ । আমাদের নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে বলে, বেচারা ঠিক করাতেও পারছে না । আজ সেই ধরা পড়ে গেলো । কাল সকালেই গাড়ি থানায় জমা করে দিতে হবে । কেস দেবে একটা । কোর্ট থেকে কবে ছাড়া পাবে কে জানে ।
- কেন গো কী হল ?
উত্তরে ও যা বলল, শুনে আমাদের আকাশ থেকে পড়ার অবস্থা । তিন দিন আগেই ওর গাড়ির বাঁদিকের ডিপার ল্যাম্পটা খারাপ হয়েছে । আমরা যদিও কিছুই বুঝতে পারিনি এতক্ষণ । আমাদের নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে বলে, বেচারা ঠিক করাতেও পারছে না । আজ সেই ধরা পড়ে গেলো । কাল সকালেই গাড়ি থানায় জমা করে দিতে হবে । কেস দেবে একটা । কোর্ট থেকে কবে ছাড়া পাবে কে জানে ।
ব্যস্ত হয়ে বললাম,
- ব্যাস ? শুধু একটা ডিপার জ্বলছে না, তাতেই এত ? আমাদের ওখানে তো কত গাড়ির হেড লাইটই জ্বলে না । রাস্তার আলোয় পথ চলে । ইনডিকেটর কাজ করে না । ড্রাইভিং লাইসেন্সই নেই কত জনের ....।
আমাকে থামিয়ে দিয়ে রাজু বলল, এখানে ওসব চলে না সাব ।
- ব্যাস ? শুধু একটা ডিপার জ্বলছে না, তাতেই এত ? আমাদের ওখানে তো কত গাড়ির হেড লাইটই জ্বলে না । রাস্তার আলোয় পথ চলে । ইনডিকেটর কাজ করে না । ড্রাইভিং লাইসেন্সই নেই কত জনের ....।
আমাকে থামিয়ে দিয়ে রাজু বলল, এখানে ওসব চলে না সাব ।
একটু থেমে, ফের মরিয়া হয়ে বললাম,
- তা কিছু দিয়ে রফা করে নিলে না কেন ? আর তো কেউ ছিল না এখানে । দশ বিশ টাকা দিয়ে দিলেই তো ঝামেলা মিটে যেত ।
এবার হেসেই ফেললো ছেলেটা । বলল,
- নেহি দাদা, উ সব ইঁহা নেহি চলতা । ছোটা জাগাহ, সব আদমি সবকো পহচান্তা হ্যায় । উ পয়সা নেহি লেগা হামসে । হাম বোলেগা ভি নেহি । নেহি তো কেস গড়বড় হো যায়েগা ।
- তা কিছু দিয়ে রফা করে নিলে না কেন ? আর তো কেউ ছিল না এখানে । দশ বিশ টাকা দিয়ে দিলেই তো ঝামেলা মিটে যেত ।
এবার হেসেই ফেললো ছেলেটা । বলল,
- নেহি দাদা, উ সব ইঁহা নেহি চলতা । ছোটা জাগাহ, সব আদমি সবকো পহচান্তা হ্যায় । উ পয়সা নেহি লেগা হামসে । হাম বোলেগা ভি নেহি । নেহি তো কেস গড়বড় হো যায়েগা ।
শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করার ঢঙ্গে বললাম,- কাল যদি না-ই যাও থানায় ? একেবারে কাজ করিয়ে নাও গ্যারেজে ?
ঈষৎ হতাশ সুরে সে বলল, নেহি হোগা সাব । গাড়িকা নম্বর লিখ লিয়া । ম্যায় তো ভাগ নেহি না সকতা হুঁ আন্দামান ছোড় কর । আপ লোগ নেহি সমঝ পাও গে । মেন ল্যান্ড মে রহতে হো না আপ.. !
লো জি, আপকা হোটল আ গিয়া । চিন্তা মত কিজিয়ে, কাল সে দুসরা গাড়ি ভেজেগা রাজেন্দর ভাই নে । আপকো কোই তকলিফ নেহি হোগা । ......গুড
নাইট !
চার নম্বর রাজ্য সড়ক, গ্রেট
আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড দিয়ে হু হু করে ছুটে চলেছে আমাদের মহিন্দ্রা ম্যাক্স ।
গন্তব্য ওয়ান্ডুর । পোর্টব্লেয়ারের একদম দক্ষিণ
প্রান্তের এক ছোট্ট জনপদ । সেখান থেকে বোট নিয়ে যেতে হবে রেড স্কিন আইল্যান্ড ।
যেখানে দেখা মিলবে সমুদ্রের তলার অচেনা জগতের বাসিন্দাদের । আশিসদার মতে, যা না দেখলে নাকি আন্দামানে আসা বৃথা ।
আজ আন্দামানে চতুর্থ দিন । সকালটা যথারীতি সূর্য্যকরোজ্বল । আমরা
সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছি । রাজু আসেনি আজ । ট্যাভেরাও নয় । আজ ম্যাক্স নিয়ে এসেছে
সিরাজুল । এ ছেলেটিও ভাল । কথা কম বলে । স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে এক মনে গাড়ি
চালাচ্ছে । অনেকটা পথ । প্রায় তিরিশ কিলোমিটার । নটার মধ্যে পৌঁছাতে হবে । গিয়ে
আবার টিকিট কাটা আছে । এই এক ব্যাপার । সব কিছুর জন্যই টিকিট লাগে এখানে । আর লাগে
পরিচয় পত্র । আইনের হাত এখানে যে সত্যিই লম্বা, তার প্রমাণ তো গত কাল
রাত্রেই পেয়েছি । বেচারা রাজুর জন্য মন খারাপ লাগছে ।
সূর্য্যদেব এখানে রোজ সাড়ে পাঁচটায় উঠে পড়ছেন দেখছি । আর ছ'টা থেকেই তাঁর প্রবল তেজে চোখ কড়কড় করছে । অক্টোবর মাসের শেষ দিকে রোদের যে মিঠে স্বাদ, তা তো এখানে পাওয়া যাচ্ছে না । বরং ভরা গ্রীস্ম যেন । সারা দিন ঠা ঠা রোদ । আকাশে তেমন মেঘ নেই । নির্মেঘই বলা চলে । নীল চাঁদোয়ায় মোড়া । দিনও কিছু বড় নয় গ্রীস্ম কালের মত । সন্ধ্যা হচ্ছে ঠিক সাড়ে পাঁচটায় ।আর দেখতে না দেখতেই অন্ধকার নেমে আসছে । ছটার মধ্যে নিকষ অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে চার পাশ । ব্যাপারটা ছেলে গুলোরও নজরে পড়েছে । গাড়িতে যেতে যেতে ওরা নিজেদের মধ্যে এই নিয়ে আলোচনাও করছে । দেখে ভালো লাগলো । ওদের বোঝানোর চেষ্টা করলাম,
সূর্য্যদেব এখানে রোজ সাড়ে পাঁচটায় উঠে পড়ছেন দেখছি । আর ছ'টা থেকেই তাঁর প্রবল তেজে চোখ কড়কড় করছে । অক্টোবর মাসের শেষ দিকে রোদের যে মিঠে স্বাদ, তা তো এখানে পাওয়া যাচ্ছে না । বরং ভরা গ্রীস্ম যেন । সারা দিন ঠা ঠা রোদ । আকাশে তেমন মেঘ নেই । নির্মেঘই বলা চলে । নীল চাঁদোয়ায় মোড়া । দিনও কিছু বড় নয় গ্রীস্ম কালের মত । সন্ধ্যা হচ্ছে ঠিক সাড়ে পাঁচটায় ।আর দেখতে না দেখতেই অন্ধকার নেমে আসছে । ছটার মধ্যে নিকষ অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে চার পাশ । ব্যাপারটা ছেলে গুলোরও নজরে পড়েছে । গাড়িতে যেতে যেতে ওরা নিজেদের মধ্যে এই নিয়ে আলোচনাও করছে । দেখে ভালো লাগলো । ওদের বোঝানোর চেষ্টা করলাম,
- বিষুব রেখার কাছে হওয়ার সুবাদে, এই ঘটনা ঘটছে । এখানে সূর্য্য সারা বছরই মাথার উপর থাকে । প্রায় নব্বই
ডিগ্রী কোনে আলো ছড়ায় । ভূপৃষ্ঠের ঘুর্ণন বেগ সব চেয়ে বেশি বিষুব রেখা অঞ্চলে ।
তাই সূর্য্যের সাপেক্ষে ভূমির সরণও বেশি । যে জন্য সূর্য্য ডুবে গেলেই অন্ধকার
নেমে আসে এখানে । সকালও হয় দ্রুত । চব্বিশ ঘন্টার অর্ধেক দিন আর অর্ধেক রাত্রি
কথাটাও একেবারে সত্যি এখানে ।
.....বলতে চাইছিলাম আরো অনেক কিছু । কিন্তু ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া আমাদের ছেলেরা সরণ, ঘুর্ণন, প্রভৃতি খটমট শব্দের মানে বুঝতে পারছিল না । তাই ভূগোলের ক্লাস বন্ধ করলাম । ওদের সব প্রশ্নের জবাব ইংলিশে দেওয়ার ফান্ডা আমার নেই । অগত্যা.... ।
.....বলতে চাইছিলাম আরো অনেক কিছু । কিন্তু ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া আমাদের ছেলেরা সরণ, ঘুর্ণন, প্রভৃতি খটমট শব্দের মানে বুঝতে পারছিল না । তাই ভূগোলের ক্লাস বন্ধ করলাম । ওদের সব প্রশ্নের জবাব ইংলিশে দেওয়ার ফান্ডা আমার নেই । অগত্যা.... ।
আমার অক্ষমতার সাহায্যার্থে এবার আশিসদা মুখ খুলল । বলল,
- মেরু
অঞ্চল, মানে পোলার রিজিয়নে, ছ'মাস দিন আর ছ'মাস রাত কেন হয় জানিস তোরা ? দুজনেই এক বাক্যে বলে উঠল,
- ওই তো, সামার সোলস্টিসের
জন্যে । যখন যে পোলটা সুর্য্যের দিকে থাকে তখন সেদিকে দিন । আর অন্য দিকে রাত,
সিম্পল ।
মুচকি হেসে আশিসদা বলল,
মুচকি হেসে আশিসদা বলল,
- তাই ? সিম্পল ? তাহলে ওখানে, ছ'মাস একটানা দিন
হয় কেন বোঝা তো দেখি । কই আর কোথাও তো এমন হয় না ?
আর বাছাধনদের মুখে বাক্যি সরে না । আশিসদা এবার বলতে লেগেছে,
- আসলে দিন রাত তো সুর্য্যের জন্য হয় না । হয়
পৃথিবীর জন্য । আরো পরিস্কার করে বললে, পৃথিবী নিজের এক্সিসে
ঘোরার জন্য । কিন্তু নর্থ পোল ও সাউথ পোল দিয়েই যেহেতু এক্সিসটা যাচ্ছে, তাই ওই রিজিয়নে পৃথিবীর ঘোরাটাও নেগ্লিজিবল । আর ইকুয়েটর রিজিয়নে এটাই সব
চেয়ে বেশি .......।
এবার দু'জনেই লাফিয়ে উঠল,
- ও, বুঝেছি বুঝেছি । সেই
জন্যই পোলার রিজিয়নে ছ'মাস একটানা দিন বা রাত থাকে । আর
এখানে, ইকুয়েটরের কাছে, হয় তার উল্টো ।
বারো ঘন্টা দিন, বারো ঘন্টা রাত ।
- ঠিক তাই ।
এবার আমি মুখ খুললাম । শত হোক, মাস্টারি তো আমার পেশা । যদিও, মনে মনে আশিসদাকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম । আর মুখে বললাম, তোমার গুরু মাস্টারি করা উচিত ছিল । অনেক ছাত্রর উপকার হত তাহলে ।
- ঠিক তাই ।
এবার আমি মুখ খুললাম । শত হোক, মাস্টারি তো আমার পেশা । যদিও, মনে মনে আশিসদাকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম । আর মুখে বললাম, তোমার গুরু মাস্টারি করা উচিত ছিল । অনেক ছাত্রর উপকার হত তাহলে ।
হো হো করে হেসে উঠে রাষ্টায়ত্ত কারখানার অফিসার, আশিসদা
বলল,
- আরে না না, তুমি যখন
বোঝাচ্ছিলে তখন আমারও মনে পড়ে গেলো কিছু কিছু । তাই বলে দিলাম । ও মাস্টারি আমার
কম্ম নয় ।
আমাদের সম্মিলিত হাসির মাঝে হঠাৎ সিরাজুলের গলা পাওয়া গেলো ।
- গাছে আম হয়ে আছে দেখুন ।
আম ? এই অসময়ে ? সিরাজুলের কথা মানা যাচ্ছে না । আমাদের অবিশ্বাসি মনের কথা বুঝেই, একটা বড় গাছের নীচে গাড়িটা থামালো সে । রাস্তার ধারে বিশাল আম গাছ । সবুজ পাতায় ঝাপড়া হয়ে আছে । সিরাজুল গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে আম খুঁজতে লাগলো । আমরা অবিশ্বাসীর দৃষ্টিতে ওর কান্ড কারখানা দেখছি । হঠাৎ বিজয়ীর হাসি মুখে ঝুলিয়ে, গাছের একটা ডালের দিকে আঙ্গুল তুলে, সে বলে উঠল,
- গাছে আম হয়ে আছে দেখুন ।
আম ? এই অসময়ে ? সিরাজুলের কথা মানা যাচ্ছে না । আমাদের অবিশ্বাসি মনের কথা বুঝেই, একটা বড় গাছের নীচে গাড়িটা থামালো সে । রাস্তার ধারে বিশাল আম গাছ । সবুজ পাতায় ঝাপড়া হয়ে আছে । সিরাজুল গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে আম খুঁজতে লাগলো । আমরা অবিশ্বাসীর দৃষ্টিতে ওর কান্ড কারখানা দেখছি । হঠাৎ বিজয়ীর হাসি মুখে ঝুলিয়ে, গাছের একটা ডালের দিকে আঙ্গুল তুলে, সে বলে উঠল,
- ওই দেখুন আম ।
এবার আমাদের অবাক হওয়ার পালা । সত্যিই ওর আঙ্গুল বরাবর দৃষ্টি
নিক্ষেপ করে দেখতে পাচ্ছি দু' তিনটে আম ঝুলছে গাছের ডালে । পাকা নয়, একেবারে কাঁচা । এটা কোন প্রজাতির আম, এতো দেরিতে হয়
? প্রশ্ন করতে যাব, সিরাজুল বলে উঠল,
- এখানে এমনই । সারা বছরই গাছে আম ধরে । সংখ্যায়
বেশি না হলেও, হয় । সারা বছর গরম, সারা
বছর আম ।
বুঝলাম, এতক্ষণ আমাদের কথা, আলোচনা,
গাড়ি চালাতে চালাতেই, মন দিয়ে শুনেছে ও ।
বুঝতেও পেরেছে নিশ্চয়ই । তাই আরেকটু ইনপুট দিয়ে দিল । মনে পড়ে গেলো, সেলুলার জেল দেখাতে দেখাতে গাইড শের সিং বলেছিল,
এখানে শিক্ষিতের হার খুব বেশি । প্রায় চুরানব্বই শতাংশ । সিবিএসই বোর্ডের সরকারি বেসরকারি স্কুল আছে প্রচুর । ইয়ং জেনারেশন প্রায় সবাই শিক্ষিত । সবাই চার পাঁচটা ভাষা জানে । আর সবাই আন্দামানকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে ।
....সাবাস আন্দামান ।
ওয়ান্ডুর পৌঁছালাম বেলা নটা নাগাদ । ছুটির দিনে অনেকেই এই সময় বিছানা ছাড়ে । যে দলে অবশ্যই আমিও পড়ি । কিন্তু আমার আজ ঘুম ভেঙ্গে গেছে বেশ তাড়াতাড়ি । জলের তলায় উঁকি মেরে প্রবাল দ্বীপ দেখার প্রোগ্রাম আছে আজ । রেড স্কিন আইল্যান্ডে । সম্ভবত সেই উত্তেজনাতেই সকাল সাড়ে ছ'টায় উঠে পড়েছি বিছানা ছেড়ে । নতুন কিছু দেখা বা জানার ব্যাপারে, এখনো, এই আধ বুড়ো বয়সেও, কৈশোরের অপার বিস্ময় ঘিরে ধরে আমাকে । এখন যত দিন যাচ্ছে, চুলের সফেদি বাড়ছে । প্রায় সাদা হয়ে এল মাথা । ভেতর থেকে টের পাচ্ছি, জীবনের সেরা সময় পেরিয়ে চলে এসেছি প্রায় । কিন্তু প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছি, ''বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি ?''
হোটেল থেকে শুধু চা বিস্কুট খেয়ে বেরিয়েছিলাম । গাড়িতে আসতে আসতে
আবার ভূগোলের ক্লাস চলেছে । আম গাছে ঝুলন্ত কাঁচা আম দেখেছি বটে, কিন্তু
খাওয়ার প্রশ্ন ছিল না । সবারই পেটে রীতিমত বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হয়েছে । একটা
সাইনবোর্ডওলা বড় খাবারের দোকানের সামনে সিরাজুলকে গাড়ি থামাতে বললাম । ও মাথা নেড়ে,
আরো খানিকটা এগিয়ে এসে, অন্য একটা দোকানের
সামনে গাড়ি থামালো । এখানে অবশ্য একটা নয়, অনেক খাবারের
দোকান । স্টেশন চত্বরের মত । আর সবাই এক সাথে ডাকাডাকি করতে লেগেছে ।
ব্যাপারটা, ঠিক হজম হল না । সিরাজুলের আবার কমিশনের চক্কর আছে নাকি ? আমাদের আসানসোল-কলকাতা বাসগুলোর যেমন বাঁধা দোকান আছে শক্তিগড়ে । কেউ ''ল্যাংচা হাবে'' থামে, তো কারোর টিকি ''ল্যাংচা ঘরে'' বাঁধা । তেমন ? ভুরুটা আপনা থেকেই উপর দিকে উঠে গেলো ।
সিরাজুলকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ও বলল,
ব্যাপারটা, ঠিক হজম হল না । সিরাজুলের আবার কমিশনের চক্কর আছে নাকি ? আমাদের আসানসোল-কলকাতা বাসগুলোর যেমন বাঁধা দোকান আছে শক্তিগড়ে । কেউ ''ল্যাংচা হাবে'' থামে, তো কারোর টিকি ''ল্যাংচা ঘরে'' বাঁধা । তেমন ? ভুরুটা আপনা থেকেই উপর দিকে উঠে গেলো ।
সিরাজুলকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ও বলল,
- সবার আই কার্ড নিয়ে এক জন আমার সঙ্গে চলুন,
টিকিট গুলো কেটে নিই । বাকিরা ততক্ষণ এখানে খাওয়া দাওয়া করে নিন ।
বেলা তিনটের আগে কিন্তু আর কিছু জুটবে না ।
শুভদা গেলেন সিরাজুলের সঙ্গে টিকিট কাটতে । আমরা যেখানে থেমেছি, তার
সামনেই বেশ বড় জায়গা নিয়ে, মহাত্মা গাঁধি মেরিন ন্যাশনাল
পার্কের অফিস কাম টিকিট কাউন্টার । সিকিউরিটির কড়াকড়ি চোখে পড়ার মত । ওরা গেটের
ভেতর ঢুকতেই, আমরা বাকিরা, খাবারের
সন্ধানে একটা দোকানে ঢুকলাম । গরম গরম লুচি, আলুর তরকারি,
আর জিলিপি, পেট ভরে খেলাম । দোকানি
ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা, সম্ভবত স্বামি-স্ত্রী । কথার টানে বুঝলাম
পূর্ববঙ্গের । রান্নার সোয়াদ অপূর্ব । কফি খেতে খেতে শুভদাও এসে হাজির । হাতে
কতকগুলো মোটা লাল সুতোর মালা । তাতে আবার নম্বর ট্যাগ ঝুলছে । বললেন,
- এগুলো সবাই গলায় পরে নাও । যেন হারিয়ে ফেলো না ।
ফিরে এসে এখানেই আবার জমা দিতে হবে । ওরা মাথা গুনে নৌকায় ওঠাবে । আমাদের বোটের
নাম এম ভি চিত্রলেখা । সবাই মনে রেখো । আর যারা যারা বাথরুম যাবে চলে যাও, দারুণ ব্যবস্থা । আমি ততক্ষণ চট করে কিছু খেয়ে নিই । আমাদের বোট কিন্তু রেডি ।
খাবারের পয়সা দিতে গিয়ে চোখ কপালে ওঠার যোগাড় । রাস্তার ধারের, প্লাস্টিকের
চেয়ার টেবিল পাতা, অতি সাধারণ দোকান হোলে কী হবে, দাম একদম স্টার হোটেলের মত । কফি বলে ত্রিশ টাকা কাপ ? লুচি দশ টাকা পিস ? ব্যাটা সিরাজুলের কমিশন কত হতে
পারে, হিসাব করতে লেগেছি । দোকানদার ভদ্রলোক বোধহয় শুনে
ফেলেছে আমাদের আলোচনা । হঠাৎ শুনি বলছে,
- আপনেরা একটা ভুল করতে আছেন । এই হানে, আন্দামানে তো কিছুই হয় না । সবই জাহাজে চাইপ্পা আসে । আপনের কফি খাওনের
কাগজের কাপটাও জাহাজ ভাড়া দিয়া আনাইতে লাগে । তয় বোঝেন, দাম
তো বেশি হইবই ।
অবিশ্বাসীর গলায় বললাম,
অবিশ্বাসীর গলায় বললাম,
- তাই বলে এত ? আমরা তো না হয়
দু দিনের জন্য এসেছি । কাল বাদে পরশু চলে যাব । কিন্তু এখানকার বাসিন্দারা,
এত দাম দিয়ে, খায় কি করে রোজ ?
দোক্তা পান খাওয়া কালো দাঁত বার করে, লোকটা এবার, বৌয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল । তারপর বলল,
- এখানকার বাসিন্দারা এই দোকানে খায় না । তাদের জইন্য
অন্য দোকান আছে । এই একটু আগেই, মোড় ঘুরতে, একটা বড় সাইন বোর্ডওলা দোকান আছে, ফেরার পথে দেইখ্যা
নিয়েন । ওই দোকানটা এখানকার বাসিন্দাদের জইন্য । ভর্তুকি যুক্ত খাবারের দোকান ।
সাইনবোর্ডেই লেখা দেখতে পাবেন, শুধুমাত্র আইল্যান্ডারদের
জন্য । আপনাদের দিবে না ।
জানতে চাইলাম,
জানতে চাইলাম,
- বুঝবে কী করে ?
উত্তর পেলাম,
- এই দ্বীপে সবার কার্ড আছে । আইল্যান্ডার কার্ড ।
বুঝলাম, ওই কার্ড যাদের আছে তারা সব কিছুই ভর্তুকিতে পায় ।
পর্যটকদের সে সুবিধা নেই । আরও বুঝলাম, সিরাজুল কেন তখন ওই
দোকানের সামনে দাঁড়াতে চায়নি ।
...সত্যি, বিপুলা এই ভারতের কতটুকুই বা জানি ?
...সত্যি, বিপুলা এই ভারতের কতটুকুই বা জানি ?
তিনটে দু'লিটারের জলের বোতল হাতে ঝুলিয়ে জেটির দিকে পা
বাড়ালাম । ভীড় ভালোই হয়েছে । অনেক নৌকা ছেড়ে যাচ্ছে । সবার গন্তব্য রেড স্কিন
আইল্যান্ড । আশিসদার তথ্য, বছরের কিছুটা সময় জলি বয়, কিছু
সময় রেড স্কিন আইল্যান্ড খোলা থাকে পর্যটকদের জন্য । এখানকার কোরাল রিফ ও মেরিন
লাইফ, বৈচিত্রের দিক দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পাল্লা দেয় ।
শুনেই কেমন রোমাঞ্চ হচ্ছে ।
চিত্রলেখার সারেং, হাত মাইকে, তার যাত্রীদের ডাকাডাকি করছে । আমাদের দেখেই বলল, এই বোতল চলবে না ।
- মানে ? জল খাবো কী করে ? সমুদ্রের নোনা জল খেতে হবে নাকি ?
বোটের গাইড হাসি মুখে বুঝিয়ে দিলেন, আমরা যেখানে যাবো, সেটা কঠোর ভাবে ''প্লাস্টিক বর্জিত'' এলাকা । তাই জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট, কিছুই নিয়ে যাওয়া চলবে না । জলের জন্য ওয়াটার বটল ভাড়া পাওয়া যায় টিকিট কাউন্টারে । খালি বোতলের ভাড়া দশ টাকা । জমা রাখতে হবে দু'শ টাকা প্রতি বোতল । বোতল জমা দিলে এক'শ নব্বই টাকা ফেরত পাওয়া যাবে ।
চক্ষু ছানাবড়া হলেও নান্যপন্থা । অগত্যা, তিনটি বোতলের জন্য ছ'শ টাকা জমা করে, তাতে বিসলারির জল ঢেলে নিলাম । বিস্কুটের প্যাকেট কেনা হয়েছিল বাচ্চাদের কথা ভেবে । খুলে কাগজের ঠোঙ্গায় ভরে নিলাম । তারপর গলায় কন্ঠির মালা (লাল সুতোর নম্বর ট্যাগ) ঝুলিয়ে নৌকায় চাপলাম । জ্বালাতনের এক শেষ ।
আমরা ছাড়া আরো দশ বারো জন আছেন চিত্রলেখায় । স্বপন বাবু আমাদের গাইড । সারেং, চিত্ত বিশ্বাস বোট ছেড়ে দিলেন । দুর্গা... দুর্গা...।
ছোট বোট । জনা কুড়ি পঁচিশ লোক নিয়ে ভট ভট শব্দ তুলে চলেছে । দুপাশে সরে যাচ্ছে একের পর এক জঙ্গল ঘেরা দ্বীপ । গাইড স্বপন বাবু বলে চলেছেন, আন্দামানের প্রাকৃতিক সম্পদ কীভাবে তাঁরা চোখের মনির মত রক্ষা করছেন । এই জল-জঙ্গল-পাহাড়-প্রকৃতির অপূর্ব মিলনভূমি আসলে ভারতের জাতীয় সম্পদ । প্রকৃতির আপন খেয়ালে, গভীর সমুদ্রের মাঝখানে জেগে উঠেছে এই দ্বীপ মালা । আজ থেকে কত হাজার বছর আগে কেউ জানে না । অপার প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ এই অঞ্চল ঠাঁই পেয়েছে ইউনেস্কোর তালিকায় ।
চিত্রলেখার সারেং, হাত মাইকে, তার যাত্রীদের ডাকাডাকি করছে । আমাদের দেখেই বলল, এই বোতল চলবে না ।
- মানে ? জল খাবো কী করে ? সমুদ্রের নোনা জল খেতে হবে নাকি ?
বোটের গাইড হাসি মুখে বুঝিয়ে দিলেন, আমরা যেখানে যাবো, সেটা কঠোর ভাবে ''প্লাস্টিক বর্জিত'' এলাকা । তাই জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট, কিছুই নিয়ে যাওয়া চলবে না । জলের জন্য ওয়াটার বটল ভাড়া পাওয়া যায় টিকিট কাউন্টারে । খালি বোতলের ভাড়া দশ টাকা । জমা রাখতে হবে দু'শ টাকা প্রতি বোতল । বোতল জমা দিলে এক'শ নব্বই টাকা ফেরত পাওয়া যাবে ।
চক্ষু ছানাবড়া হলেও নান্যপন্থা । অগত্যা, তিনটি বোতলের জন্য ছ'শ টাকা জমা করে, তাতে বিসলারির জল ঢেলে নিলাম । বিস্কুটের প্যাকেট কেনা হয়েছিল বাচ্চাদের কথা ভেবে । খুলে কাগজের ঠোঙ্গায় ভরে নিলাম । তারপর গলায় কন্ঠির মালা (লাল সুতোর নম্বর ট্যাগ) ঝুলিয়ে নৌকায় চাপলাম । জ্বালাতনের এক শেষ ।
আমরা ছাড়া আরো দশ বারো জন আছেন চিত্রলেখায় । স্বপন বাবু আমাদের গাইড । সারেং, চিত্ত বিশ্বাস বোট ছেড়ে দিলেন । দুর্গা... দুর্গা...।
ছোট বোট । জনা কুড়ি পঁচিশ লোক নিয়ে ভট ভট শব্দ তুলে চলেছে । দুপাশে সরে যাচ্ছে একের পর এক জঙ্গল ঘেরা দ্বীপ । গাইড স্বপন বাবু বলে চলেছেন, আন্দামানের প্রাকৃতিক সম্পদ কীভাবে তাঁরা চোখের মনির মত রক্ষা করছেন । এই জল-জঙ্গল-পাহাড়-প্রকৃতির অপূর্ব মিলনভূমি আসলে ভারতের জাতীয় সম্পদ । প্রকৃতির আপন খেয়ালে, গভীর সমুদ্রের মাঝখানে জেগে উঠেছে এই দ্বীপ মালা । আজ থেকে কত হাজার বছর আগে কেউ জানে না । অপার প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ এই অঞ্চল ঠাঁই পেয়েছে ইউনেস্কোর তালিকায় ।
ভারত সরকার এই অঞ্চলকে সংরক্ষিত জল ও বনভূমির মর্যাদা দিয়েছে । সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে গোটা আন্দামান । প্রকৃতির এই অপরূপ রূপ তারা, ''সভ্যতার'' ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে, একই রকম রেখে দিতে চায় ।
পর্যটক হিসাবে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে । এখানকার অনাঘ্রাত প্রকৃতির ছবি আমরা যত খুশি নিয়ে যেতে পারি । কিন্তু একটা ঝিনুকও সঙ্গে নিয়ে বোটে চড়া যাবে না । আইনগত বাধা তো আছেই, সিকিউরিটি চেকিং হবে ফেরার সময় । তাছাড়া, এভাবে সবাই যদি একটা করে ঝিনুক বা কোরালের টুকরো স্মারক হিসাবেও নিয়ে যায়, তবে একদিন আন্দামানে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না ।
হঠাৎ একটা বাঁক ঘুরে নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলো । ধীর গতিতে বোট
গিয়ে থামল একটা দ্বীপের কাছে । এটাই রেড স্কিন আইল্যান্ড ? না কোন
জেটি নেই এখানে । হাঁটু জল ঠেলে দ্বীপের দিকে এগিয়ে যেতে হবে । কিন্তু এ কী ?
এ কোথায় এলাম রে বাবা ? জঙ্গল ঘেরা দ্বীপের
মাটিতে সাদা সাদা বলের মত ওগুলো কী ? মানুষ বা কোন প্রাণীর
মাথা, হাড়গোড় পড়ে আছে না ? তবে কি এই
দ্বীপে মানুষ খেকোদের বাস ? জারোয়া বা ওঙ্গিজরা মানুষ খেকো ?
আশিসদার কথায় এ কোথায় এসে পড়লাম রে বাবা ! বৌ বাচ্চা নিয়ে ফিরে যেতে
পারব তো আসানসোলে ?
গোটা দ্বীপটা কেমন ভৌতিক লাগছে না ? মনে হচ্ছে অরণ্যদেব বেরিয়ে
আসবে এখুনি, খুলি গুহা থেকে । আর অমনি কিছু আদিবাসী শিকারি,
মুখে দুর্বোধ্য আওয়াজ করে, বল্লম হাতে আমাদের
ঘিরে ফেলবে । এই সব আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতে, জল ঠেলে ডাঙ্গার
দিকে এগোচ্ছি ।....ও হরি, এ গুলো তো মানুষের মাথা নয় । এ তো ঝিনুক আর শামুকের খোল । বিশাল বিশাল । মানুষের মাথার থেকেও বড় । কোন কোন ঝিনুক প্রায় কুলোর মত । শঙ্খগুলো ফুটবলের মত । গোটা চত্বরে ছড়িয়ে আছে । অগুনতি, অসংখ্য । দূর থেকে এগুলোকেই মানুষের মাথার খুলি ভেবেছিলাম ।
ইস, এত ঝিনুক শঙ্খ এখানে, এভাবে, অযত্নে পড়ে আছে ? একেই বোধহয়, ''সভ্যতার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে'' প্রকৃতিকে রক্ষা করা বলে ! বিস্ময়ের ঘোর আর কাটতেই চায় না ।
''এম ভি চিত্রলেখা'' ডাক শুনে চটকা ভাঙ্গল । স্বপন বাবু এবং চিত্ত বাবু, চিত্রলেখার যাত্রীদের স্নরকেলিং করার জন্য ডাকছেন । টিকিটের সঙ্গে প্রত্যেকের, দশ মিনিটের স্নরকেলিং ফ্রি । তার চাইতে বেশি সময় করতে হলে আলাদা পয়সা লাগবে । জলের তলায় অক্সিজেন সিলিন্ডার পিঠে নিয়ে হাঁটতে দেখেছি ডিস্কভারি চ্যানেলে । যাকে সি ওয়াক বা স্কুবা ডাইভিং বলে । তাও করা যায় এখানে । তবে ডাক্তারের ফিট সার্টিফিকেট লাগে । আমরা সেসব কিছুই আনিনি । আর সাঁতারও জানি না । তাই স্নরকেলিংই করব ঠিক হল ।
চোখে সুইমিং চশমা পরিয়ে নাকটা একটা ক্লিপ দিয়ে বন্ধ করে দিল ।
তারপর মুখে একটা নল ঢুকিয়ে দাঁত ও ঠোঁট দিয়ে সেটা শক্ত করে চেপে রাখতে বলা হল ।
নলটার অপর প্রান্ত উপর দিকে উঠে রয়েছে । ওই পথেই, মুখ দিয়ে, নিশ্বাস প্রশ্বাস চলবে । নাক থাকবে বন্ধ । সাঁতার জানি না বলে, বুকের কাছে, দুই বগলের তলা দিয়ে, পরিয়ে দেওয়া হল হাওয়া ভরা টিউব । ব্যাস, এই বার উপুড়
হয়ে, জলে ভেসে থাকতে আর কোন সমস্যাই নেই । ভেসে ভেসে দেখতে
থাকুন অতল জলের রহস্য ।
গাইড বলে বলে দিচ্ছেন, ওই দেখুন ক্লাউন ফিশের ঝাঁক । ওই হলুদ ফুলের মত, ওটা ওয়াটার লিলি । এই যে দেখছেন পাথর পাথর, এগুলো সব কোরাল । এর খাঁজে দেখুন, নীল ঢেউ খেলানো, বড় বড় ঝিনুক লুকিয়ে আছে । ওই ঝিনুকে মুক্তো হয় । আর ওই কালো রঙের কাঁটার বলের মত দেখতে, ওটা সি অর্চিন । মারাত্মক বিষ ওর কাঁটায় । ভুলেও ছোঁবেন না । সমুদ্র শসা চেনেন ? স্টার ফিশ ? ওই দেখুন......। এমনি আরো কত কী । সমুদ্রের তলায় যে এত বিচিত্র প্রাণী ও গাছপালার সম্ভার আছে না দেখলে বিশ্বাস করাই মুশকিল ।
এক এক করে সবার স্নরকেলিং হয়ে গেলো । কিন্তু আশ মিটল কই ? সমুদ্রের বিপুল জলরাশির তলায় লুকিয়ে থাকা অপার ঐশ্বর্য্য ও বিস্ময়ের হদিশ যে তখন আমরা পেয়ে গেছি । তাই মাত্র দশ মিনিটের স্নরকেলিঙ্গে পোষাবে কেন ? ঠিক করলাম, সবাই মিলে গ্লাস বটম বোটে চেপে একটা চক্কর মারবো । আধা ঘন্টা ছ'শ টাকা । চল, তাই সই ।
গাইড বলে বলে দিচ্ছেন, ওই দেখুন ক্লাউন ফিশের ঝাঁক । ওই হলুদ ফুলের মত, ওটা ওয়াটার লিলি । এই যে দেখছেন পাথর পাথর, এগুলো সব কোরাল । এর খাঁজে দেখুন, নীল ঢেউ খেলানো, বড় বড় ঝিনুক লুকিয়ে আছে । ওই ঝিনুকে মুক্তো হয় । আর ওই কালো রঙের কাঁটার বলের মত দেখতে, ওটা সি অর্চিন । মারাত্মক বিষ ওর কাঁটায় । ভুলেও ছোঁবেন না । সমুদ্র শসা চেনেন ? স্টার ফিশ ? ওই দেখুন......। এমনি আরো কত কী । সমুদ্রের তলায় যে এত বিচিত্র প্রাণী ও গাছপালার সম্ভার আছে না দেখলে বিশ্বাস করাই মুশকিল ।
এক এক করে সবার স্নরকেলিং হয়ে গেলো । কিন্তু আশ মিটল কই ? সমুদ্রের বিপুল জলরাশির তলায় লুকিয়ে থাকা অপার ঐশ্বর্য্য ও বিস্ময়ের হদিশ যে তখন আমরা পেয়ে গেছি । তাই মাত্র দশ মিনিটের স্নরকেলিঙ্গে পোষাবে কেন ? ঠিক করলাম, সবাই মিলে গ্লাস বটম বোটে চেপে একটা চক্কর মারবো । আধা ঘন্টা ছ'শ টাকা । চল, তাই সই ।
ছোট নৌকার তলায় কাচ লাগানো । জলের তলাটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে । জলও
তেমনি । যেন গলানো কাচ । স্থির নিস্তরঙ্গ । রোদ পড়ে একদম তলা অবধি পরিষ্কার দেখা
যাচ্ছে ।
কত যে মাছ, শঙ্খ, জলজ প্রাণী দেখলাম বলে বোঝাতে পারব না । এদের অনেককেই আগের দিন সমুদ্রিকা আর একোরিয়ামে দেখেছিলাম । আজ চোখের সামনে, হাতের নাগালে, তাদেরই চলে ফিরে বেড়াতে দেখে রোমকূপ খাড়া হয়ে গেল । নাঃ মানতেই হবে, আশিসদার জোরাজুরিতে আন্দামান বেড়াতে না এলে, অনেক কিছুই অজানা থেকে যেত জীবনে ।
কত যে মাছ, শঙ্খ, জলজ প্রাণী দেখলাম বলে বোঝাতে পারব না । এদের অনেককেই আগের দিন সমুদ্রিকা আর একোরিয়ামে দেখেছিলাম । আজ চোখের সামনে, হাতের নাগালে, তাদেরই চলে ফিরে বেড়াতে দেখে রোমকূপ খাড়া হয়ে গেল । নাঃ মানতেই হবে, আশিসদার জোরাজুরিতে আন্দামান বেড়াতে না এলে, অনেক কিছুই অজানা থেকে যেত জীবনে ।
প্রায় দু ঘন্টা কখন যে পেরিয়ে গেছে, এই সব করতে, টেরই পাইনি । চিত্ত বাবুর হাত মাইক জানিয়ে দিল সময় শেষ । জল থেকে উঠে
পড়লাম । চাটাই ঘেরা ঘরে পোশাক বদল করে চিত্রলেখায় ফিরতে ফিরতে দেড়টা বাজলো ।
এতক্ষণ পর আবার টের পেলাম, পেটে কারা যেন খোল করতাল নিয়ে
কীর্তন শুরু করেছে । আজ লাঞ্চে কব্জি ডুবিয়ে খাবো । যত টাকা লাগে লাগুক । আজ কোন
কিপ্টেমি করবো না । বেঙ্গল হোটেলে কাঁকড়ার স্পেশাল ডিশটা আজ ট্রাই করে দেখলে কেমন হয় ? শুনেছি
নাকি দারুণ বানায় । দাম যদিও, গায়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার মত । তিনশ
টাকা প্লেট । তা হোক, আজ টাইগার ক্র্যাবই খাব । আজকের দিনটা
স্পেশাল । জীবনের খাতায় সোনালি অক্ষরে বাঁধিয়ে রাখার মত দিন । এমন অভিজ্ঞতা,
এমন দিন, খুব বেশি আসে না জীবনে । এর একটা সেলিব্রেশন হবে না ?
তাই হয় ?
ও হো ! কী বানিয়েছে ডিশটা ! বিশাল সাইজের টাইগার ক্র্যাব ! এক
পিসেই প্লেট ভরে গেছে । অন্তত ছ'সাত ইঞ্চি ডায়ামিটার কাঁকড়াটার । আসানসোল তো দূর,
কলকাতাতেও এই সাইজের কাঁকড়া পাওয়া মুশকিল । আর কী অপূর্ব স্বাদ ।
সেই সঙ্গে অসাধারণ রন্ধনশৈলী । বলা ভালো, রসনার অবর্ণনীয়
তৃপ্তি । খেয়ে দিল তর.র.র... হয়ে গেলো । দাম দিতে, ততটা গায়ে
লাগলো না আর । ....আহা আন্দামান ! .....ওহো ....আন্দামান !
উল্কার গতিতে ছুটছে আমাদের জাহাজ । কালো
জলের উপর সাদা ফেনার দাগ কেটে । দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির মাঝে, মানব
সভ্যতার একমাত্র নিদর্শন । ইন্ডিয়ান নেভির, এম ভি নর্থ প্যাসেজ । এদের ভাষায় অবশ্য,
জাহাজ নয়, বোট । যাত্রী যে মাত্র শ'দেড়েক । সঙ্গে কিছু মাল পত্র, বোঁচকা-বুঁচকি,
দুটো বোলেরো, একটা ট্রাক । এখানকার
দ্বীপগুলোতে যাতায়াতের প্রধান অবলম্বন এই মিনি জাহাজ । বড় জাহাজের প্রায় সব
বিশেষত্বই আছে এগুলোর । এমনকি, সাদা পোষাক পরিহিত, ঝক ঝকে স্মার্ট চেহারার, অনর্গল মুখে ইংরাজি খই ফোটা,
নেভাল অফিসার পর্যন্ত । আজ আমরাও সওয়ার হয়েছি তাতে । গন্তব্য
হ্যাভলক দ্বীপ । আধুনিক জাহাজে চাপার অভিজ্ঞতাও হয়ে গেলো এই সুযোগে ।
পোর্টব্লেয়ার ছেড়েছি সকাল সাড়ে ছ'টায় । রস আইল্যান্ডের পাশ কাটিয়ে কিছুটা গিয়ে আন্দামান সাগরে পড়েই জাহাজ গতিবেগ বাড়ালো । ধীরে ধীরে সব দ্বীপ চোখের আড়ালে । পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ কোন দিকেই কিছু নেই আর । মাথার উপরে বিশাল চাঁদোয়ার মত নীল আকাশ । মেঘের বংশ নেই । নেই কোন ধুলি কনা অথবা ধোঁয়ার আস্তরণ । স্ফটিক স্বচ্ছ নীলিমার শোভা, বরং কিছুটা খন্ডন করেছে, ঝক ঝকে সার্চ লাইটের মত, উজ্বল সূর্য্যের আলো । সকাল সাতটায়, মাত্র কুড়ি ডিগ্রি কৌণিক উচ্চতা থেকেই সে যা তেজ দেখাচ্ছে, বেলা বাড়লে যে অবস্থা কোথায় পৌঁছাবে, ভেবে কূল কিনারা পাচ্ছি না ।
পোর্টব্লেয়ার ছেড়েছি সকাল সাড়ে ছ'টায় । রস আইল্যান্ডের পাশ কাটিয়ে কিছুটা গিয়ে আন্দামান সাগরে পড়েই জাহাজ গতিবেগ বাড়ালো । ধীরে ধীরে সব দ্বীপ চোখের আড়ালে । পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ কোন দিকেই কিছু নেই আর । মাথার উপরে বিশাল চাঁদোয়ার মত নীল আকাশ । মেঘের বংশ নেই । নেই কোন ধুলি কনা অথবা ধোঁয়ার আস্তরণ । স্ফটিক স্বচ্ছ নীলিমার শোভা, বরং কিছুটা খন্ডন করেছে, ঝক ঝকে সার্চ লাইটের মত, উজ্বল সূর্য্যের আলো । সকাল সাতটায়, মাত্র কুড়ি ডিগ্রি কৌণিক উচ্চতা থেকেই সে যা তেজ দেখাচ্ছে, বেলা বাড়লে যে অবস্থা কোথায় পৌঁছাবে, ভেবে কূল কিনারা পাচ্ছি না ।
কিনারা অবশ্য নীচেও নেই । যেদিকে তাকাই অফুরান জলরাশি । কালো কুচকুচে গলানো পিচ যেন । সকালের হাল্কা হাওয়ায় ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ তুলে বোটের চার দিকে নেচে বেড়াচ্ছে । সেই কালো, ত্রিভুজাকৃতি ঢেউয়ের মাথায় সুর্যের আলো পড়ে হিরার দ্যূতি ঠিকরোচ্ছে । মুহূর্তেরও ভগ্নাংশ সময়ে, সে হিরক খন্ড, দর্শকের চোখে ধরা দিয়েই আবার মিলিয়ে যাচ্ছে । জাহাজের প্রপেলারের ধাক্কায়, প্রচন্ড বেগে ছুটে চলা জলের উপর, আবার সাদা ফেনার মুক্তা হার তৈরি হচ্ছে । অগুনতি মুক্তো আর সবুজ পান্না দিয়ে গাঁথা, নববধূর গলার নেকলেস যেন । কানের ঝুমকো, নাকের নথ, পায়ের মল, মাথার টিকলি ইত্যাদি আরো সব গয়নার সম্ভার জাহাজের চতুর্দিকে ভাসছে । মনে হচ্ছে, মনি-মুক্তো-হিরা-জহরতের পুরো সিন্দুকটাই কেউ খুলে ছড়িয়ে দিয়েছে জলের উপরে । আর আমাদের দেখার সুবিধার জন্য, সেই অলঙ্কার রাজি নেচে নেচে, ভেসে চলেছে জাহাজের চার পাশে ।

জল ও সূর্য্যালোকের যুগলবন্দিতে সৃষ্ট, এই
মোহনী নৃত্যনাট্য, চোখের সামনে অভিনিত হয়ে চলেছে অবিরাম ।
তার সৌন্দর্য্য ও বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব । কোন ক্যামেরার সাধ্য নেই এই
ছবিকে হুবহু ফ্রেম বন্দি করে । সে দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না । চোখ ঝলসে
যায় । সে দিক থেকে বেশিক্ষণ চোখ ফিরিয়ে রাখা যায় না । এমনই দুর্বার তার যাদুকরী
আকর্ষণ ।
বেলা একটু বাড়তে ডেকের থেকে নেমে এলাম সবাই । রোদে আর উপরে থাকা যাচ্ছে না । নিচেটা এয়ার কন্ডিশন্ড । বসার সুন্দর ব্যবস্থা । দুটো বড় টিভিও আছে । অক্ষয় কুমারের কোন একটা হিন্দি সিনেমা চলছে তাতে । ছেলেগুলো হৈ হৈ করে দেখতে লাগলো সেই ঢিসুম ঢিসুম । আমার উল্টো দিকের সিটে বসে আছে একটি বছর ছয় সাতের মেয়ে । পাশে তার মা । তরুণীই বলা চলে । সঙ্গে আর কোন পুরুষ মানুষ আছে বলে মনে হল না । মাকে, নাগাড়ে, কী নিয়ে যেন, অভিযোগ জানিয়ে যাচ্ছে সেই মেয়ে । পোশাক আশাক দেখে কেমন সন্দেহ হল । পর্যটক তো মনে হচ্ছে না ! সাহসে ভর করে আলাপ জমালাম । সঙ্গে আমার স্ত্রী আছে, ভয় কি ?
যা ভেবেছি ঠিক তাই । এরা আইল্যান্ডার । এদের টিকিটের দাম আমাদের দশ
ভাগের এক ভাগ ! পুজোর ছুটিতে বাপের বাড়ি, পোর্টব্লেয়ারে এসেছিল । এখন হ্যাভলকে, শ্বশুর বাড়ি, ফিরছে । কাল থেকে মেয়ের স্কুল খুলে
যাবে । কিন্তু মেয়ের আরো কিছু দিন দাদুর বাড়ি থাকার ইচ্ছে । এত তাড়াতাড়ি ছুটি
ফুরিয়ে যাওয়া মোটে পছন্দ নয় তার । তাই গোঁসা হয়েছে ।
মনে মনে বললাম, ঠিকই তো, এত অল্প সময়ে কি সব
আনন্দ মেটে ? আমরাও তো আন্দামান ভ্রমণ শেষ করে ফেললাম প্রায়
। কিন্তু আশ মিটছে কই ?
হ্যাভলক দ্বীপের বিশেষত্ব হল গাছ । বিশাল বিশাল উচ্চতার গাছে মোড়া
এই দ্বীপ । পঞ্চাশ-ষাঠ ফুট উঁচু গাছ তো সাধারণ । কোন কোন গাছ একশ' ফুট
উচ্চতাও ছাড়িয়ে যায় এখানে । গোল থামের মত মসৃণ গুঁড়িগুলো সোজা উঠে গেছে আকাশে । ওই
উপরে, মাথার কাছে, অল্প কিছু ডালপালা
আর পাতা দেখা যায় । যেন আকাশের ঝুল ময়লা পরিষ্কার করবে বলে, পাশাপাশি
অন্য সব গাছকে টপকে গলা বাড়িয়েছে ।
গাছ ছাড়া, এখানকার পশুপাখির সম্ভারও উল্লেখ করার মত । অসংখ্য
প্রজাতির পাখি, প্রজাপতি, কীট পতঙ্গ
এখানকার সম্পদ । ছোট্ট দ্বীপে এক সময় সাপের উপদ্রব ছিল প্রচন্ড । বর্তমানে,
মানুষের সংখ্যা যত বাড়ছে, বন্য প্রাণীর সংখ্যা
পাল্লা দিয়ে কমছে ।
মূলত বাংলাদেশ থেকে আগত স্মরণার্থীদের জমি দেওয়া হয়েছে এখানে । কাউকে দশ একর, কাউকে পাঁচ একর । কেউ সে জমিতে, জঙ্গল কেটে ধান চাষ করছেন । কেউ করেছেন ফলের বাগান ।
ইদানিং, কেউ কেউ আবার, সেখানেই চাটাইয়ের বেড়ার নিকোবরি হাট বানিয়ে লজ হিসাবে পর্যটকদের ভাড়া দিচ্ছেন । বিদেশি পর্যটকদের খুব পছন্দের জায়গা এই হ্যাভলক । মাসের হিসাবে ঘর ভাড়া নেয় ওরা । সারা দিন সোনালি বিচে শুয়ে বসে কাটিয়ে দেয় । আর সন্ধ্যায় চাটাইয়ের ঘরে ফিরে ঘুম লাগায় ( সম্ভবত ) ।
এরকমই তিনটে নিকোবরি হাট নিলাম আমরা । গ্রীনল্যান্ড হোটেলে । মেঝে
সিমেন্টের । লাগোয়া বাথরুমে জলের কল বেসিন সবই আছে । খালি, ছাদটা
টিনের আর দেয়াল মোটা কাঠের পাটা দিয়ে তৈরি । বিছানা পাতা আছে যে খাটের উপরে,
সেটিও প্রচন্ড ভারী, মোটা মোটা পাটা দিয়ে
বানানো । ছেলেরা নাক সিঁটকে দিল । আমাদেরও অবস্থা তথৈবচ । কিন্তু হ্যাভলকে অধিকাংশ
হোটেলই নাকি এই রকম, গ্রীনল্যান্ডের মালিক, বিপুল বিশ্বাসের দাবি এমনটাই । অবিশ্বাসীর দৃষ্টিতে আশিসদার সিকে ফিরে
দেখি, সে মিটি মিটি হাসছে । বুঝলাম এ ব্যাপারটা তার আগে
থেকেই জানা ছিল । অগত্যা...... ।
- মালপত্র রেখে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও সবাই, আমরা
সমুদ্রে স্নান করতে যাব ।
আশিসদা ঘোষণা করে দিল । শুনে মনে পড়ল, আন্দামান
এসে অবধি, সমুদ্রে স্নান করা বলতে যা বোঝায়, তা একেবারেই হয়নি । গত কাল রেডস্কিন আইল্যান্ডে কোরাল দেখতে, নোনা জলে ডুব দিয়েছি বটে, কিন্তু তাকে ঠিক সমুদ্র
স্নান বলা যায় না । এক তো ওখানকার জলে কোন ঢেউ ছিল না । বিচের বালিও না থাকার মত ।
পুরী দিঘা দুরের কথা, মিনিমাম বক খালির সমুদ্রেও চান করা এর থেকে ভালো
অনুভূতি ।
আশিসদাকে সে কথা মনে করাতে যেতেই, হাত তুলে আমায় থামিয়ে দিল । বলল,
আশিসদাকে সে কথা মনে করাতে যেতেই, হাত তুলে আমায় থামিয়ে দিল । বলল,
- হোটেল নিয়ে এবং আরো যা যা কিছু নিয়ে তোমাদের
যাবতীয় অভিযোগ ভুলে যাবে, এমন সমুদ্রে তোমাদের নিয়ে যাবো এখন
। এশিয়ার সেরা বিচ ! পৃথিবীর সেরা একশ'টি বিচের অন্যতম,
রাধানগর বিচে আজ সমুদ্র স্নান করব আমরা । চান ক'রে উঠে পরার পোশাক, তোয়ালে ইত্যাদি একটা ব্যাগে ভরে
নিয়ে চল হাঁটা লাগাই । শুনতে পাচ্ছ না সমুদ্র আমাদের ডাকছে ?
রাধানগর সমুদ্র তটের বর্ণনা করা আমার পক্ষে অসম্ভব । এমনও হয়
সমুদ্র ? এমনও হয়, বিচের বালির রং ? এমনও
হয়, তার উপরে আছড়ে পড়া ঢেউ ? দেখেই
প্রেমে পড়ে গেলাম । যাকে বলে লাভ এট ফার্স্ট সাইট । সবাই মিলে নেমে পড়লাম জলে ।
দেশি বিদেশি পর্যটকের ভিড় ততক্ষণে জল থেকে উঠে আসছে । আমরাই দেরি করে ফেলেছি ।
পুরির সমুদ্রের মতই উঁচু ঢেউ । কিন্তু জল অত্যন্ত পরিষ্কার ।
স্বচ্ছ সবুজ আভা ছড়াচ্ছে যেন । প্রচন্ড গর্জনে আছড়ে প'ড়ে,
সাদা ফেনায় ঢেকে দিচ্ছে বালু তট । তারই সঙ্গে বয়ে আনছে অগুনতি শঙ্খ,
ঝিনুক, জলজ প্রাণির দেহাবশেষ । যার কিছু পড়ে
থাকছে বালির উপর । কিছু আবার ফিরে যাচ্ছে জলের ফিরতি টানে । প্রায় তিন শ' মিটার চওড়া সাদা বালির বিচ । লম্বায় কয়েক কিলোমিটার তো হবেই । জলের রং
হাল্কা সবুজ থেকে নীলচে সবুজ, তারপর ঘন নীল এবং সব শেষে
কালচে নীল । বালির রংটাও অদ্ভুৎ । হাল্কা ক্রিম কালার । মুঠো করে হাতে তুলে নিয়ে
আরও অবাক হয়ে গেলাম । আমাদের পরিচিত বালির মত মনে হচ্ছে না তো ! পাথরের গুঁড়ো বা
ধুলোও নয় । বরং অনেক হাল্কা । শঙ্খ বা ঝিনুকের গুঁড়ো যেন ।রাজস্থানের মরুভূমিতে ঈষৎ লালচে, মিহি পাউডারের মত বালি দেখে অবাক হয়েছিলাম । আর্দ্রতার ছোঁয়াচ বিহীন সে বালির সমুদ্রে প্রতি মুহূর্তে হাওয়ার স্রোত বয়ে যায় । আর সেই হাওয়ার রগড়ানিতে, বালির দানাগুলি আরও সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হতে থাকে । আর এখানে, ভেজা ভেজা আর্দ্র হাওয়ায়, সমুদ্রতটে জড়ো হওয়া কোরাল শঙ্খ ঝিনুকের দেহাবশেষ গুঁড়ো হয় একই নিয়মে । হাওয়ার সঙ্গে এখানে সমুদ্রের ঢেউও এই কাজে হাত লাগায় । তারপর সেই সাদা গুঁড়ো মিশে যায় এখানকার বালিতে । তাই এখানকার বালির রং অমন ফ্যাকাশে সাদা ।
কথাটা কে প্রথম তুলেছে, জানার
আর উপায় নেই । কিন্তু মহিলা মহলের আলোচনার বিষয় বস্তু জানতে পেরে, রীতিমত পুলকিত হলাম । এত রোমান্টিক হয়ে গেছেন
ওঁরা প্রকৃতির মাঝে এসে ? এই বয়সে, স্বামী সংসারের নিন্দা চর্চা ছাড়া অন্য কোন
বিষয়ে, খুব একটা আগ্রহ তো দেখি না আজকাল । সেখানে একেবারে......
?
ঘটনাটা তাহলে খুলেই বলি । সকালে প্রচুর সমুদ্র স্নান হয়েছে ।
দুপুরে সামুদ্রিক ভেটকি মাছের ঝোল, আর ডাল, আলু ভাজা, গন্ধ লেবু দিয়ে গরম ভাত খেয়ে বেশ এক ঘন্টা দিবা নিদ্রাও হয়েছে । চারটে
বাজতে না বাজতেই আশিসদা তাড়া লাগিয়ে আমাদের নিয়ে আবার রাধানগর বিচে হাজির । অপূর্ব
সূর্যাস্ত দেখলাম । ধীরে ধীরে আকাশ কালো হয়ে এল । কালো হয়ে গেলো চারপাশের সব কিছু
। এই বিচে আলোর ব্যবস্থা নেই । বিচের এক পাশের জঙ্গল, আর
অন্য পাশের সমুদ্রের রং, এক হয়ে গেলো । মানুষজন সব সিলুয়েট,
ছায়া ছায়া । শুধু কিছু ক্যামেরার ঝলকানি আর ঢেউয়ের মাথায় সাদা ফেনার
নাচন । দেখতে দেখতে ভাবছি এবার ফেরা যাক । ঠিক সেই সময় আশিসদার ছেলে দিনো এসে বলল
কথাটা ।
- বাবা, ঢেউ কি কথা বলে ? হাওয়া কথা
বলে ? ওদের ভাষা কি বোঝা যায় ?
ক্লাস সিক্সের নিষ্পাপ প্রশ্নে, ফিরে তাকাতেই হল । দেখলাম দিনোর
সঙ্গে, আমার সেভেনে পড়া ছেলে, পুপুও
উৎসুক দৃষ্টিতে উত্তরের অপেক্ষা করে আছে ।
আশিসদা হেসে ফেললো । বলল,
- কেন, হঠাৎ ঢেউয়ের ভাষা জানতে
চাইছিস তোরা ?
পুপু বলল,
পুপু বলল,
- মায়েরা তো তাই বলছে ।
এবারে আমাদের চমকাবার পালা । জিজ্ঞেস করলাম,
- কী বলছে ?
- বলছে, ওই ঢেউ, এই হাওয়া নাকি অনেক কথা বলছে । চুপ করে কান পেতে শুনলে নাকি বোঝা যাবে । ...সত্যি বোঝা যাবে ?
- বলছে, ওই ঢেউ, এই হাওয়া নাকি অনেক কথা বলছে । চুপ করে কান পেতে শুনলে নাকি বোঝা যাবে । ...সত্যি বোঝা যাবে ?
তাদের সম্মিলিত প্রশ্নে অবিশ্বাস স্পষ্ট । আরও জানা গেলো, তিন মাঝ
বয়সি মহিলা, সংসার চিন্তা ছেড়ে নাকি এই নিয়েই কথা বলছেন
নিজেদের মধ্যে ।
সন্ধ্যার নিভন্ত আলোয়, দূর থেকে দেখলাম, ভারত মহাসাগরের নোনা হাওয়ায় চুল উড়িয়ে, বালির উপর পা ছড়িয়ে বসে আছে তিন সদ্য কিশোরী । এই নীলাভ অন্ধকারে, তাদের চোখের তারায় প্রতিফলিত হচ্ছে অপার্থিব আলোর বিন্দু । কালো ঢেউয়ের চূড়ায় নাচতে থাকা, সাদা ফেনার মুকুটের মাথায় ঝিকিয়ে ওঠা, ফসফরাসের সবজে আলোর বিন্দু......।
- নিশ্চয়ই আছে । এই হাওয়া, ঢেউ, জঙ্গল, আকাশ সবার ভাষা আছে । প্রকৃতির নিজস্ব ভাষায় কথা বলে ওরা । সে ভাষা মন
দিয়ে শুনলে বোঝাও যায় । প্রকৃতির সন্তান, এই অঞ্চলের
ভূমিপুত্র জারোয়া ওঙ্গিজরা সে ভাষা বোঝে । আর বোঝে বলেই সুনামির সময়, জলোচ্ছ্বাস হওয়ার আগে, তারা বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে
নিরাপদ দূরত্বে ও উচ্চতায় পৌঁছে গেছিলো । এত বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়, এত মানুষ মারা গেছে সে বছর সুনামিতে । কিন্তু এক জন জারোয়াও মারা যায়নি ।
তাহলে..?
উইকিপিডিয়া একবার খুললে আর বন্ধ হতে চায় না । আশিসদাও বলতে লেগেছে
- বরং সভ্যতার (?) সংস্পর্শে এসেই ওরা বিপদে পড়েছে । স্বাধীনতার পর
থেকে বহু বছর ধরে ওদের 'সভ্য' বানানোর
চেষ্টা করা হয়েছে । ফল হয়েছে মারাত্মক । মাত্র এক শ'র কিছু
বেশিতে এসে ঠেকেছে জারোয়াদের জনসংখ্যা । ওঙ্গিজরা জনা চল্লিশের মত । পৃথিবীর
আদিমতম জনগোষ্ঠীর প্রতিভু, এই দুই মানব প্রজাতি আজ অবলুপ্তির
পথে । আমাদের মত পর্যটকদের ক্যামেরাবন্দী হতে গিয়ে আর আধুনিক (?) মানুষের কৌতুহল মেটাতে গিয়ে, এদের জীবনযাত্রায় ভয়ানক
ক্ষতি হয়েছে । নানারকম রোগ-ভোগ অসুস্থতায় লুপ্তপ্রায় হতে চলেছে এরা । আশার কথা,
অনেক দেরীতে হলেও ভারত সরকার এই সত্য বুঝতে পেরেছে । জারোয়াদের সভ্য
করার পরিকল্পনা ত্যাগ করে, সভ্যতার ছোঁয়াচ বর্জিত দ্বীপে
সরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের । সেখানে পর্যটক কেন, কারোর যাওয়ার
পার্মিশান নেই । সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশে নিজেদের মত করে বেড়ে উঠছে তারা । এই
ঢেউ, হাওয়া, জঙ্গল তাদের সঙ্গে কথা বলে
। তারাও বোঝে সে ভাষা । আমরা, সভ্য মানুষই কেবল বুঝতে পারি
না । অথবা বুঝতে চাই না... ।
মন্ত্র মুগ্ধের মত শুনছিলাম সবাই । কখন পিছনে মহিলারাও এসে
দাঁড়িয়েছে টের পাইনি । পূজা বৌদি তাড়া লাগালো,
- হয়েছে, এবার লজে ফের । রাত হয়ে এল । আমরা ছাড়া বিচে আর
কেউ নেই । খেয়াল করেছো ?
তাকিয়ে দেখি, সত্যি, আমরা ক’জন ছাড়া
রাধানগর বিচ ছেড়ে ততক্ষণে, সবাই যে যার চলে গেছে । হাওয়া,
ঢেউ, এসবের সঙ্গে তখন যোগ দিয়েছে তৃতীয়ার চাঁদ
। কোজাগরি চাঁদের সে মোহময় আলো সাদা বিচের বালিতে মাখামাখি । আকাশে সলমা চুমকি
ছড়িয়ে তারারা ঝিকমিক করছে । স্বর্গীয় এই দৃশ্য কে দেখল, বা
দেখল না, তাতে বিশ্বপ্রকৃতির কী যায় আসে ?
গ্রিনল্যান্ড রিসর্টে টিভি রেডিও কিছুই নেই । ফোনের টাওয়ারও
হামেশাই থাকছে না । কারেন্ট অবশ্য আছে । ফ্যান চলছে বাঁই বাঁই করে । বড় ডাইনিং হলে
সার দিয়ে টেবিল চেয়ার পাতা । অন্তত কুড়ি জন একসাথে বসে খেতে পারে । কিন্তু বোর্ডার
নামমাত্র । আমরা ছাড়া আরও নাকি দুটি ঘরে লোক আছে । সম্ভবত নিউজিল্যান্ডের বাসিন্দা
। শুনলাম, তারা অনেক রাতে, বাইরে থেকে পানাহার সেরে ফেরে ।
মানে সন্ধ্যেবেলাটা শুধুই আমরা ।
পিঁয়াজি আর চা সহযোগে গানের আসর বসল ডাইনিং হলে । আশিসদার দারুণ
গলা । একসময় নিয়মিত স্টেজ শো করতো । মান্না দে, ভুপেন হাজারিকা, কুমার শানু কন্ঠস্থ । শুভদার স্ত্রীও এককালে দুর্দান্ত গাইতেন । এখনো গলা
শুনলে বোঝা যায় । মাঝে মাঝে আমিও গলা মেলালাম । প্রায় দু ঘন্টার জমাটি আসর । শেষে,
''সোহাগ চাঁদ বদনি ধনী....'' দিয়ে ধুলোট ।
সঙ্গে দু'হাত তুলে সম্মিলিত নাচ । আসর ভাঙল ''ডিনার রেডি'' শুনে ।
আমরা ছাড়া তখন সেখানে হাজির, রিসর্টের সব স্টাফ ও আসে পাশের কিছু বাসিন্দা । আমাদের মত তাদের চোখমুখেও খুশির ঝিলিক । ইতিমধ্যে বেশ কিছু গানের রিকোয়েস্টও এসেছে ওই দিক থেকে । ছেলেগুলো খেয়াল করেছে, ওদের মধ্যে অনেকেরই চোখ একটু বেশিই লাল । মুখে বিশেষ গন্ধ ।
হোটেলের মালিক বিশ্বাসবাবু বললেন,
আমরা ছাড়া তখন সেখানে হাজির, রিসর্টের সব স্টাফ ও আসে পাশের কিছু বাসিন্দা । আমাদের মত তাদের চোখমুখেও খুশির ঝিলিক । ইতিমধ্যে বেশ কিছু গানের রিকোয়েস্টও এসেছে ওই দিক থেকে । ছেলেগুলো খেয়াল করেছে, ওদের মধ্যে অনেকেরই চোখ একটু বেশিই লাল । মুখে বিশেষ গন্ধ ।
হোটেলের মালিক বিশ্বাসবাবু বললেন,
- আপনাদের মতন বোর্ডার বড় একটা আসে না এদিকে ।
শুভদা তেরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
শুভদা তেরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
- আমাদের মতন মানে ?
উত্তরে, আর কথা না বাড়িয়ে, বত্রিশ পাটি বার করে হাসলেন বৃদ্ধ । দেখলাম, উপরের পাটির সামনের দুটো দাঁত নেই । চোখ দুটো বেশ গাঢ় লাল । আর গায়ে সেই সন্দেহজনক গন্ধ । শুভদাও চুপ করে গেলো ।
উত্তরে, আর কথা না বাড়িয়ে, বত্রিশ পাটি বার করে হাসলেন বৃদ্ধ । দেখলাম, উপরের পাটির সামনের দুটো দাঁত নেই । চোখ দুটো বেশ গাঢ় লাল । আর গায়ে সেই সন্দেহজনক গন্ধ । শুভদাও চুপ করে গেলো ।
*****
২৩ অক্টোবর, সকাল ৮টা । বীর সাভারকার
আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের লাউঞ্জে বসে আছি । আজ ফিরে যাব । আর এক ঘন্টা পরে
ফ্লাইট । আমাদের
ইমিগ্রেশন চেকিং হয়ে গেছে । খুব কড়া চেকিং । বিশেষ করে মহিলাদের । হাত ব্যাগ উপুড়
করে চেক করছে । কোরাল, ঝিনুক, শঙ্খ যার
কাছে যা পাচ্ছে, সব রেখে দিচ্ছে । সঙ্গে জুটছে তিরস্কার ।
রীতিমত কাঁদিয়ে ছাড়ছে ।
আমাদের মহিলাদের হাসি মুখেই বেরিয়ে আসতে দেখলাম চেকিং এরিনা থেকে । তারা যে যা কিনেছিল তার রশিদ সঙ্গে রাখতে বলে দিয়েছিল আশিসদা । তাই অসুবিধা হয়নি । রশিদ যারা দেখাতে পারেনি, তাদের নাকি যা তা বলছে । আশিসদার নিজের হাত ব্যাগ থেকে অবশ্য একটি দাড়ি কামানোর ব্লেড পাওয়া গেছে । আন্দামানে এসে কিনেছিল । এরা রেখে নিল । হাজার হোক অস্ত্র বলে কথা ......।
আমাদের মহিলাদের হাসি মুখেই বেরিয়ে আসতে দেখলাম চেকিং এরিনা থেকে । তারা যে যা কিনেছিল তার রশিদ সঙ্গে রাখতে বলে দিয়েছিল আশিসদা । তাই অসুবিধা হয়নি । রশিদ যারা দেখাতে পারেনি, তাদের নাকি যা তা বলছে । আশিসদার নিজের হাত ব্যাগ থেকে অবশ্য একটি দাড়ি কামানোর ব্লেড পাওয়া গেছে । আন্দামানে এসে কিনেছিল । এরা রেখে নিল । হাজার হোক অস্ত্র বলে কথা ......।
সাত দিন আগে ঠিক এই সময়, এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং-এ আন্দামান ল্যান্ড করেছিলাম
আমরা । আজ সেটারই ফিরতি ফ্লাইট ধরব । কিন্তু তার আগে কলকাতার ফ্লাইটটা আসা জরুরি ।
মনে হচ্ছে আজ লেট হবে । হোক, আমাদের কোন তাড়া নেই ।
ইনফ্যাক্ট, এত তাড়াতাড়ি আন্দামান ছেড়ে যেতে, মন সায় দিচ্ছে না কারুর । মাত্র সাত দিনেই এই দ্বীপভূমির প্রেমে পড়ে গেছি
। আমার বৌ তো ঘোষণাই করে দিয়েছে,
- রিটায়ারমেন্টের পর আন্দামানেই এসে থাকবে ।
....হুঁ, যেন ছেলের হাতের মোয়া ।
- রিটায়ারমেন্টের পর আন্দামানেই এসে থাকবে ।
....হুঁ, যেন ছেলের হাতের মোয়া ।
প্লেনে ব্রেকফাস্ট দেবে । তবু ছেলেগুলোকে নিয়ে ফুড কোর্টের দিকে
গেলো ওদের মায়েরা । কিছু কিনে দেবে বোধ হয় । এয়ারপোর্ট লাউঞ্জের এই দোকানগুলোয় সব
জিনিসের খুব দাম । আশিসদার ভাষায় 'ডলার প্রাইস' । কিন্তু বাড়ন্ত বয়সে
ঘন্টায় ঘন্টায় খিদে পায় । আর তাছাড়া, এই কদিনের অভিজ্ঞতায়, ডলার
প্রাইসে অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমরা ।
আশিসদা ও শুভদা গেল টয়লেটের খোঁজে । প্লেনের ভ্যাকুয়াম টয়লেটের অত্যাধুনিক ব্যবস্থা পছন্দ নয় ওদের । তিন ফ্যামিলির তিনটে হাত ব্যাগ, যেগুলো হাতে নিয়ে প্লেনে উঠব, পাহারার দায়িত্ব আমার উপর দিয়ে, সবাই নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে । আমিও এই সুযোগে লেখাটা নিয়ে বসে গেলাম । কাল আর পরশু একদম বসা হয়নি । হবে কী করে ? যে ব্যস্ততা আর মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন ছিলাম দু'দিন ! বিশেষ করে গত কাল বিকেলের অভিজ্ঞতাটার তো কোন তুলনা নেই । একদম হলিউডের ফিকশন ফিল্ম । বিশ্বাস করুন, পুরো 'লাইফ অফ পাই' । উফফফ..... ! ভাবতে এখনও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে ।
আশিসদা ও শুভদা গেল টয়লেটের খোঁজে । প্লেনের ভ্যাকুয়াম টয়লেটের অত্যাধুনিক ব্যবস্থা পছন্দ নয় ওদের । তিন ফ্যামিলির তিনটে হাত ব্যাগ, যেগুলো হাতে নিয়ে প্লেনে উঠব, পাহারার দায়িত্ব আমার উপর দিয়ে, সবাই নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে । আমিও এই সুযোগে লেখাটা নিয়ে বসে গেলাম । কাল আর পরশু একদম বসা হয়নি । হবে কী করে ? যে ব্যস্ততা আর মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন ছিলাম দু'দিন ! বিশেষ করে গত কাল বিকেলের অভিজ্ঞতাটার তো কোন তুলনা নেই । একদম হলিউডের ফিকশন ফিল্ম । বিশ্বাস করুন, পুরো 'লাইফ অফ পাই' । উফফফ..... ! ভাবতে এখনও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে ।
হ্যাভলকে দ্বিতীয় দিন, মানে ২১ তারিখ সকালটা, আসেপাশের
রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়ে আর রাধানগর বিচের বালিতে হেঁটেই কেটে গেল । হ্যাভলক ছোট দ্বীপ
। বন জঙ্গলে ঘেরা । রাধানগর বিচ ছাড়া আরও দুটো বিচ আছে এই দ্বীপে । সেগুলোও
বিখ্যাত । এলিফ্যানটা আর কালাপাথর বিচ । দুপুরে মাছ ভাত খেয়ে বাক্স প্যাঁটরা
গুছিয়ে, রিসর্ট ছেড়ে দিলাম । আজ রাত্রিবাস নীল আইল্যান্ডে ।
তাই আবার জাহাজে চাপতে হবে । মাত্র একঘন্টার যাত্রা এখান থেকে । তার আগে ঘন্টা
দুয়েক সময় কালাপাথর বিচে কাটানো যাবে । এলিফ্যানটা বিচ স্কুবা ডাইভিংয়ের জন্য
বিখ্যাত । আমরা গিয়ে কী করবো ?
রাধানগরের মতই কালাপাথর বিচেও বালির রং সাদা । যদিও জলের ঢেউ বেশ কম । তবে সমুদ্রের রং আরো ঘন নীল । কালো পাথরের মত দেখতে, কোরালের চাঙ্গড় জেগে আছে জলের তলা থেকে । তাই এই বিচে সমুদ্র-স্নান করা বেশ ঝুঁকির । ভারতীয় পর্যটকেরা অধিকাংশই আমাদের মত । সমুদ্রে ঝাঁপাঝাঁপি করে স্নান করতে না পারলে ঠিক পোষায় না । সেই জন্যই দেশীয় পর্যটক বড় একটা আসে না এদিকে । সেই সুযোগে বরং বিদেশিরা বেশি ভিড় করে এখানে ।
দেখলাম অনেক সাদা চামড়ার তরুণ তরুণী, ভাড়া করা সাইকেল চেপে এসে, কালাপাথর বিচের দখল নিয়েছে । ছেলেরা সবাই, খালি গায়ে, শুধু একটা হাফ প্যান্ট পরা । মেয়েরা অধিকাংশই টু পিস বিকিনিতে সুসজ্জিতা । স্বচ্ছন্দও বলা চলে । সারা গায়ে বডি অয়েল জাতীয় কিছু মেখে বালিতে উপুড় হয়ে শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে । সে দৃশ্য দেখে চোখ ও মনের অবর্ণনীয় আরাম হল বটে । কিন্তু গিন্নীদের সম্মিলিত তাড়ায়, সে সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না । নীল দ্বীপে যাওয়ার জাহাজ নাকি এসে চলে যাবে । আমাদের না নিয়েই । আমার বৌ তো প্রায় সাত কিলোমিটার দূরের জাহাজ ঘাটার সাইরেনও শুনতে পাচ্ছিল । অগত্যা, গাড়ি আমাদের নিয়ে হ্যাভলক জেটির দিকে ছুটল ।
রাধানগরের মতই কালাপাথর বিচেও বালির রং সাদা । যদিও জলের ঢেউ বেশ কম । তবে সমুদ্রের রং আরো ঘন নীল । কালো পাথরের মত দেখতে, কোরালের চাঙ্গড় জেগে আছে জলের তলা থেকে । তাই এই বিচে সমুদ্র-স্নান করা বেশ ঝুঁকির । ভারতীয় পর্যটকেরা অধিকাংশই আমাদের মত । সমুদ্রে ঝাঁপাঝাঁপি করে স্নান করতে না পারলে ঠিক পোষায় না । সেই জন্যই দেশীয় পর্যটক বড় একটা আসে না এদিকে । সেই সুযোগে বরং বিদেশিরা বেশি ভিড় করে এখানে ।
দেখলাম অনেক সাদা চামড়ার তরুণ তরুণী, ভাড়া করা সাইকেল চেপে এসে, কালাপাথর বিচের দখল নিয়েছে । ছেলেরা সবাই, খালি গায়ে, শুধু একটা হাফ প্যান্ট পরা । মেয়েরা অধিকাংশই টু পিস বিকিনিতে সুসজ্জিতা । স্বচ্ছন্দও বলা চলে । সারা গায়ে বডি অয়েল জাতীয় কিছু মেখে বালিতে উপুড় হয়ে শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে । সে দৃশ্য দেখে চোখ ও মনের অবর্ণনীয় আরাম হল বটে । কিন্তু গিন্নীদের সম্মিলিত তাড়ায়, সে সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না । নীল দ্বীপে যাওয়ার জাহাজ নাকি এসে চলে যাবে । আমাদের না নিয়েই । আমার বৌ তো প্রায় সাত কিলোমিটার দূরের জাহাজ ঘাটার সাইরেনও শুনতে পাচ্ছিল । অগত্যা, গাড়ি আমাদের নিয়ে হ্যাভলক জেটির দিকে ছুটল ।
কিন্তু আমার মাথায় একটা বেয়াড়া প্রশ্ন চাগাড় দিল । আচ্ছা, এই বিদেশিনীদের সব সময় সূর্য্যস্নান করতেই দেখি । জলে নেমে গা ভেজাতে বড়
একটা দেখি না । তা, 'সান বাথ' নেওয়ার
জন্য এদের সমুদ্রের ধারেই কেন আসতে হয় ? রৌদ্র স্নান তো যে
কোন জায়গাতেই করা যায় । মাঠে, ঘাটে, বাড়ির
ছাদে, যেখানে ইচ্ছে । জামা কাপড় ছেড়ে, তেল
মেখে মাদুরে শুয়ে পড়লেই হল । তাহলে ?...শুনেছি (সৌজন্যে, আশিসদার উইকিপিডিয়া), শীতকালে নাকি লাখো কচ্ছপ এই আন্দামান সৈকতের বালিতে ডিম পাড়তে আসে । রঙ্গতে সে দৃশ্য দেখতে, দেশি বিদেশি বহু পর্যটক আসেন শীতের ছুটিতে । তবে কি......... ? ধ্যাৎ, তা কী করে হবে ? মানুষ তো আর.......।
বিকেল চারটের বোট এল পৌনে পাঁচটায় । নীল পৌঁছাতে পৌঁছাতে গাঢ়
অন্ধকার । পার্ল বিচ রিসর্টের ঘরগুলো অসাধারণ । বিশাল এলাকা নিয়ে নারকেল গাছের চাষ
। গাছের ফাঁকে ফাঁকে সার দিয়ে একতলা কটেজ । টিনের ছাদওলা পাকা বাংলো টাইপ । সুন্দর
সাজানো ঘরের সামনে কাঠের রেলিং দেওয়া বারান্দা । পিছন দিকে লাগোয়া বাথরুম । মাঝে
তিন ফুটের প্যাসেজ ছেড়ে আবার একটা বাংলো । এই ভাবে গোটা চত্বরে অন্তত তিরিশটা ঘর ।
ঘর না বলে বাংলো বলাই উচিত । কিছু কাঠের নিকোবরি কটেজও আছে । সেগুলো নাকি
বিদেশিদের খুব পছন্দের ।
জমিটার ঠিক মাঝখানে কাঠের কারুকাজ করা ডাইনিং হল কাম রিসেপশন । এই হোটেলের নিজস্ব বিচও আছে । রুম রেন্ট বেশ চড়া । তবু আমাদের পছন্দ হয়ে গেল ।
''না হয় খরচা হবে, মাথা হবে হেঁট কি ?......" । টুর প্রায় শেষ । একটু নয় রইসি করলাম ।
জমিটার ঠিক মাঝখানে কাঠের কারুকাজ করা ডাইনিং হল কাম রিসেপশন । এই হোটেলের নিজস্ব বিচও আছে । রুম রেন্ট বেশ চড়া । তবু আমাদের পছন্দ হয়ে গেল ।
''না হয় খরচা হবে, মাথা হবে হেঁট কি ?......" । টুর প্রায় শেষ । একটু নয় রইসি করলাম ।
মালিক ভদ্রলোক দক্ষিণ ভারতীয় । মাথায় তিলক, পরনে
লুঙ্গি, ইংরাজি ছাড়া কথা চালানো মুশকিল । খুব খাতির করলেন
আমাদের । ব্যবসাটা দারুণ বোঝেন । তিনটের বদলে চারটে ঘর গছিয়ে ছাড়লেন । ছেলেগুলোর
জন্য একটা আলাদা ঘর নিতে হল । এখানে প্রতি ঘরে টিভি আছে । বাচ্চারা খুব খুশি ।
তাড়াতাড়ি ডিনার করে ওরা ওদের ''ব্যাচেলার্স'' রুমে চলে গেল । আমাদের আড্ডাও আজ জমল না । সবার চোখ যেন ঘুমে জুড়িয়ে আসছে
। আমার তো সেই কালাপাথর বিচ থেকেই ঘুম ঘুম পাচ্ছে । কেন কে জানে....... ! অনেক দিন
পর জমিয়ে.... ঘুমোলাম ।
রাত দু'টো নাগাদ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল । ছাদের টিনের
উপর বেশ ভারী কিছু একটা পড়েছে । ঢালু চাল বেয়ে গড় গড় করে গড়িয়ে ঢপ করে পাশের গলিতে
পড়ল, টের পেলাম । ডাকাত না বন বেড়াল ? নাকি
ভূত-প্রেত কিছু ? কে জানে বাবা । এবার নিশ্চয়ই উঠে এসে দরজা
ধাক্কাবে । অথবা খোলা জানালার গরাদ দিয়ে সাঁত করে ঢুকে পড়বে একেবারে ঘরের ভেতরে ।
তারপর .........
আর ভাবতে পারছি না । পাশ থেকে একটা ক্ষীণ চিঁ চিঁ শব্দ শুনে বুঝলাম আমার মত আরেকজনেরও গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না । ভয়ে জিভ শুকিয়ে কাঠ । দুজনে দুজনকে শক্ত করে জড়িয়ে মড়ার মত শুয়ে আছি । শুধু কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করছি, ব্যাপারটা কী ? জলদস্যু আক্রমন করলো, নাকি আবার সুনামি আসছে ? নাকি শুধুই ভূতের নৃত্য ? আমাদের উপর সদয় হয়ে ভূতের রাজা তিন বর দিতে এসেছেন ? .......?
আর ভাবতে পারছি না । পাশ থেকে একটা ক্ষীণ চিঁ চিঁ শব্দ শুনে বুঝলাম আমার মত আরেকজনেরও গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না । ভয়ে জিভ শুকিয়ে কাঠ । দুজনে দুজনকে শক্ত করে জড়িয়ে মড়ার মত শুয়ে আছি । শুধু কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করছি, ব্যাপারটা কী ? জলদস্যু আক্রমন করলো, নাকি আবার সুনামি আসছে ? নাকি শুধুই ভূতের নৃত্য ? আমাদের উপর সদয় হয়ে ভূতের রাজা তিন বর দিতে এসেছেন ? .......?
২২ তারিখ সকালে আশিসদার ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো । বাইরে বেরিয়ে দেখি পূজা
বৌদিকে নিয়ে সে মর্নিং ওয়াকে যাওয়ার জন্য রেডি । সুগারের পেশেন্ট আশিসদা । বেড়াতে
এসেও মর্নিং ওয়াকের নিয়মে নড়চড় হয় না । বৌদির শাসন খুব কড়া । আমাদের হাঁক ডাকে
পাশের ঘর থেকে শুভদাও উঠে পড়েছে । আমার স্ত্রী ঘুম ভেঙ্গে উঠেই, হাউ মাউ
করে, সবাইকে রাতের ঘটনাটা বলতে লেগেছে । ওর চোখমুখে আতঙ্ক
তখনও লেপ্টে আছে । ভয় আমারও কাটেনি । লোক জনের সামনে প্রকাশ করছি না, এই যা । আসলে আমার মনে হচ্ছিল, লোকে আমাদের কথা
বিশ্বাস করবে না । বলবে স্বপ্ন দেখেছি । কিন্তু দুজনে মিলে, এক
সঙ্গে, একই স্বপ্ন দেখা যায় ?
আশিসদা কিন্তু পুরোটা শুনে হা হা করে হাসতে আরম্ভ করলো । তারপর
আমাদের ডেকে পাশের গলিতে পড়ে থাকা একটা সবুজ ডাব দেখিয়ে বলল,
- ওই দেখ, ওই হচ্ছে তোমাদের
ভূত । তবে ওই ভূতকে যে নাচিয়েছে তাকে এখন দেখতে পাওয়া মুশকিল ।
আমাদের হতবুদ্ধি অবস্থা দেখে, এরপর নিজেই ওই ডাবটা হাতে করে তুলে নিয়ে এল সে । দেখলাম, সদ্য পাড়া বেশ বড়সড় সবুজ ডাব একটা । যার গায়ে প্রায় দেড় ইঞ্চি ব্যাসের একটা গর্ত । সেই গর্ত দিয়ে ডাবের শাঁস ও জল তখনো গড়িয়ে পড়ছে ।
আশিসদা বলল,
আমাদের হতবুদ্ধি অবস্থা দেখে, এরপর নিজেই ওই ডাবটা হাতে করে তুলে নিয়ে এল সে । দেখলাম, সদ্য পাড়া বেশ বড়সড় সবুজ ডাব একটা । যার গায়ে প্রায় দেড় ইঞ্চি ব্যাসের একটা গর্ত । সেই গর্ত দিয়ে ডাবের শাঁস ও জল তখনো গড়িয়ে পড়ছে ।
আশিসদা বলল,
- এ সেই রাক্ষুসে টাইগার ক্র্যাবের কীর্তি । নারকেল
গাছে চেপে ডাব পেড়ে, সেই ডাবের খোলা ফুটো করে, ভিতরের শাঁস জল খায় এরা । এই পুরো প্রক্রিয়াটা কিন্তু রাত্রের । এরা
নিশাচর । আলো ফুটলেই আর এদের দেখতে পাওয়া যায় না । কোন গর্তে লুকিয়ে পড়ে । তাই
বোধহয় ওদের নাম টাইগার । এই ফুটো ডাবটা দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, এদের দাঁড়ার শক্তি কত । ডাবের শাঁস খায় বলে এদের মাংস অত সুস্বাদু । মনে
আছে, সেদিন কেমন চেটেপুটে খেয়েছিলাম সবাই ?
মনে আবার নেই ? এই অভিজ্ঞতার পর তো আর কোন দিনই ভুলতে পারব না । বাপ রে ......!
মনে আবার নেই ? এই অভিজ্ঞতার পর তো আর কোন দিনই ভুলতে পারব না । বাপ রে ......!
দুপুরে ভরতপুর বিচে চান করলাম সবাই । নীল আইল্যান্ডের সেরা বিচ এটি
। পরিষ্কার নীল জলের তলায় শঙ্খ ঝিনুক সব দেখা যাচ্ছে । এখানে জলে কোন ঢেউ নেই ।
স্নান করা নিরাপদ । তাই ভিড় ভালোই । স্নরকেলিং, স্কুবা ডাইভিং, ইত্যাদি করার ব্যবস্থা এখানেও আছে । আমরা যেহেতু রেডস্কিন
আইল্যান্ড গেছিলাম তাই আর ও পথ মাড়ালাম না । বরং নিস্তরঙ্গ নোনা জলে আমাদের সাঁতার
শেখার প্রথম পাঠ দিলেন শুভদা । দেখিয়ে দিলেন, কীভাবে দু হাত দু পা আলতো করে ছড়িয়ে দিয়ে জলের উপর
'মড়া ভাসা' করতে হয় । সমুদ্রের জল ভারী
বলে এটা করা নাকি সহজ । ডেড সি তে নাকি জলের উপর বসেও থাকা যায় । আহা, ডেড সি যদি দেখতে যেতে পারতাম .......!দুপুরে আজ চিংড়ি খেলাম । বেশ বড় বড়, প্রন । মালাইকারির জন্য আদর্শ সাইজ । কিন্তু মালাইকারি পাওয়া গেল না । ইটালিয়ান প্রিপারেশন । বেকড প্রন । অখাদ্য । ছেলেগুলো অবশ্য 'আহা' 'আহা' করে খেলো । ওদের তো পিজা না ফিজা তাও পছন্দের । আমার গন্ধটাই পছন্দ হল না । শেষে ভেটকি নিলাম । দাম সবেরই, 'ডলার প্রাইস' ।
লাঞ্চ করেই ছুটলাম হাওড়া ব্রিজ দেখতে । ব্রিজ আকৃতির কোরাল রিফ ।
ভাটার সময় জেগে ওঠে । জোয়ারের সময় আবার তলিয়ে যায় জলের তলায় । দেখে মুগ্ধ হতে হয় ।
সত্যি প্রকৃতির কী অপুর্ব খেয়াল ।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে । আন্দামান সাগরের উপর দিয়ে ছুটছে আমাদের জাহাজ । এবার পোর্টব্লেয়ারের দিকে । আন্দামান ভ্রমন শেষ । কাল সকালেই ফিরে যাবো কোলকাতা । মনটা ভার হয়ে আছে । এই ট্রিপের অন্তিম সমুদ্র যাত্রাটা মনের মণি কোঠায় তুলে রাখব বলে ডেকের উপর দাঁড়িয়ে আছি । আমার পাশে আছে কেবল আমার ষোল বছরের বিয়ে করা স্ত্রী । দলের সবাই, মায় আমাদের ছেলেটাও নীচে, কেবিনে । বিপাশা ও জন আব্রাহামের সিনেমা দেখতে দেখতে 'রেস্ট' নিচ্ছে । পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্তগামী । যদিও সূর্যাস্ত দেখার উপায় নেই । আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ । দু এক ফোঁটা বৃষ্টিও পড়ছে । বেশ বড় বড় ফোঁটা । ডেকের উপর আরো যে কজন ছিল, বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে নীচে চলে গেল । আমরাও যাব কি যাব না ভাবছি । ওমা, বৃষ্টি থেমে গেল ।
.........এখন ডেকের উপর শুধু আমরা দুজন । টাইটানিকের পোজে জাহাজের সামনের রেলিঙ্গে উঠে দাঁড়ালে কেমন হয়, বলাবলি করছি । এমন সময় হঠাৎ নজর গেল জলের দিকে ।
.......আরে জলের উপর কোন পাখি উড়ছে না ? হ্যাঁ পাখিই তো । এক বিঘৎ লম্বা কালচে নীল রঙের পাখি । জলের উপর উড়ে উড়ে মাছ ধরছে বোধহয় । আর প্রচন্ড গতিতে ছুটে চলা এই জাহাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে ।
......মাছরাঙ্গা ? কিন্তু এই
মাঝ সমুদ্রে মাছরাঙ্গা আসবে কি করে ? তবে নিশ্চয়ই এই জাহাজের
মাস্তুলে ওর বাসা । আর সেখান থেকে প্রচন্ড গতিতে জলে ঝাঁপ দিয়ে খাবার খুঁজছে সে ।
কিন্তু তা কী করে সম্ভব ? এই জাহাজের মাস্তুল কই ? আর
তা ছাড়া এত গুলো মাছরাঙ্গা ? জাহাজের দু দিকেই ? এই আধো অন্ধকারে ? ......হতেই পারে না । এ নিশ্চয়ই
অন্য কিছু । দুজনে মিলে গবেষণা করতে লেগেছি । ওদিকে পাখির সংখ্যা বাড়ছে ।
হঠাৎ গিন্নী বলে উঠল,
হঠাৎ গিন্নী বলে উঠল,
- খেয়াল করে দেখো, পাখিগুলো জলের মধ্যে থেকেই উঠছে মনে হচ্ছে না ?
জলের মধ্যে থেকে উঠে আবার জলেই ডাইভ দিয়ে পড়ছে যেন ।
লাফিয়ে উঠলাম ওর কথা শুনে । তবে কি উড়ুক্কু মাছ ? ফ্লাইং
ফিশ ?
হ্যাঁ, তাই তো । কালচে নীল পার্শ্ব পাখনার ফ্লাইং ফিশ । পেটের কাছটা সাদা । ওই পাখনায় ভর করে পনের কুড়ি ফুট দিব্বি উড়ে যাচ্ছে । জাহাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে । আর আমরা ভাবছি মাছরাঙ্গা ।

নিজেদের আবিষ্কারে নিজেরাই হতভম্ব হয়ে গেছি । মুখে কোন কথা সরছে না আর । পাথরের মূর্তির মত জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছি । গায়ে কাঁটা দিচ্ছে । চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেছি । এক দৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছি সেই অপার্থিব দৃশ্য । আর আমাদের চোখের সামনে, বোধ হয় কোন ভূতের রাজার বরের জোরে, অভিনীত হয়ে চলেছে হলিউডের বিখ্যাত ছবি ''লাইফ অফ পাই'' । একদম লাইভ ।
তফাৎ খালি, ছবিতে মাছগুলো উড়ে এসে পাইয়ের নৌকায় উঠে পড়ছিল চিত্রনাট্যের কল্যাণে । ছবির ডিরেক্টর, অ্যাং লির দাবি মেনে । ...আর এখানে, জাহাজের আগমনে ঘাবড়ে গিয়ে মাছগুলো দ্রুত পালাতে চাইছে । তাই জাহাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে । আর তা করতে গিয়ে, অদৃশ্য কোন নির্দেশকের ইচ্ছায়, মাঝে মাঝে এরোপ্লেনের মত, হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে । দেহের আন্দাজে বেঢপ বড় দুই পার্শ্ব পাখনায় ভর করে উড়ে যাচ্ছে দশ বার ফিট । তারপর আবার ডাইভ দিয়ে এসে পড়ছে জলে ।
পশ্চিমে, ভারত মহাসাগরের কালো জলে আবির গুলে, সূর্যদেব সন্ধ্যা-তর্পণ করতে নেমেছেন ।
ছেলেরা এসে তুমুল হৈ চৈ জুড়ে দিল । কলকাতার ফ্লাইট চলে এসেছে ।
এখুনি ডাক পড়বে আমাদের । ....নাঃ, আর লেখা যাবে না । অনেক হল আন্দামান ভ্রমন । এবার
ফিরে চল পুরনো রুটিনে । ফিরে চল নিজ নিকেতনে । যদিও, মনটা
পড়ে রইল এই খানে । এই জল-জঙ্গল-প্রকৃতির মাঝে । চির সবুজ আন্দামানে ।
পুনশ্চ :- আসার দিন প্লেনের জানালা দিয়ে গাছপালা ছুটতে দেখে ভয় পেয়েছিলাম । ভেবেছিলাম, বুঝি ক্র্যাশ করবে প্লেন । আজ কিন্তু সেরকম কিছু মনে হল না । বেশ সহজ ভাবেই জানালা দিয়ে দেখলাম, কেমন নিশ্চিন্তে জঙ্গল পাহাড়ের মাথা কাটিয়ে উঁচুতে, আরো উঁচুতে উঠে পড়ছে আমাদের প্লেন । যে উচ্চতা থেকে, ক্রমশ ছোট হতে হতে, হারিয়ে যাচ্ছে আন্দামানের সব দ্বীপ, সৈকত, গাছপালা । মিলিয়ে যাচ্ছে সমুদ্র আর আকাশ । একাকার হয়ে যাচ্ছে সব, নীলিমায় ।
.....খালি তারই মাঝে, এক ঝলক কি অন্য কিছু দেখলাম ? মনে হল যেন সেরকমই । .....দেখলাম, মাঝ সমুদ্রে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে অনেকগুলো মাছ । নীল জলের মধ্যে তাদের অবয়ব চেনা যাচ্ছে শুধু । খুব ধীরে নড়াচড়া করছে তারা । .....অথবা বুঝি নড়ছেই না । শুধু জলের উপরে ভেসে আছে । রোদ পোহাচ্ছে । সান বাথ নিচ্ছে । মাঝে মাঝে ডিগবাজি খাচ্ছে । পরস্পরকে চুম্বন করছে..... ।
গভীর সমুদ্রে ওগুলো কী ? তিমি মাছ ? অত উঁচু থেকে দেখা যাচ্ছে যখন, তিমিই হবে ।
.....অথবা, হয়তো নয় । সবই হয়তো আমার মনের ভুল । আমার চশমার পাওয়ারটা হয়তো আবার বেড়েছে । তাই, কী দেখতে কী দেখছি ।
.....হয়তো ওসব কিছুই অবশিষ্ট নেই আর । সুনামির করাল গ্রাসে, কবেই সব লন্ডভন্ড হয়ে গেছে । পড়ে আছে .....কিছু প্রাণহীন, অসাড় দেহ । .....কিছু মায়া । ......কল্পনার জুরাসিক পার্ক ।
*****
অভিজিত চন্দ
Chandaabhijit2566@gmail.com
(ph.no.- 9932258681)
…..
Abhijit Chanda
4-D, Sunity Apartment,
Kalyanpur Housing,
Asansol – 713305
Bardhaman poshchim.
W.B.











































Comments
ফেসবুকে পড়েছেন নিশ্চয়ই । আমার টাইমলাইনে ধারাবাহিক লিখেছিলাম । ২০১৬ সালে । এখানে একত্রে পুরোটা পাবেন । সঙ্গে ছবি । ইচ্ছে মতো দেখে নিতে পারবেন । বইয়ের মতো ।